উঁচু ছাদের কার্ণিশে উবু হয়ে নিচের রাস্তায় দিকে তাকিয়ে থাকা আমার সেই ছোটবেলার অভ্যাস। এভাবে উবু হয়ে তাকিয়ে থেকে আমি রাস্তা দেখি, খেলনার মত চলে যাওয়া গাড়িগুলো দেখি নাকি হঠাৎ করেই; উপর থেকে নিচে তাকিয়ে থাকার একটা শূন্য
অনুভূতিকে কে অনুভব করি ঠিক জানি না। শুধু জানি বেশ অনেকক্ষণ এভাবে তাকিয়ে থাকলে
আমার মাথা ভরশূন্য হয়ে যায় চোখ ঝাপসা হয়ে আসে আর আপনমনেই আমি যেন কী সব ভাবতে থাকি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে থাকা আকাশ দেখে সাদির
কথা অনেক মনে হচ্ছে, মাঝে মাঝে মনে হয় সাদিকে বলতে চাওয়া কথাগুলো মনে মনে না ভেবে চিঠি হয়? অনেকদিন হয়ে গেছে কিছুই লেখা হয় না। ইচ্ছেগুলো আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। সংসার, সমাজ, পরিবার, কাজ সব নিয়েই ব্যস্ত
জীবন। তবে এত ব্যস্ততার মাঝেও তো বন্ধুকে মনে পড়ে। হ্যাঁ বন্ধু। ছোট্ট এই শব্দটার মাঝে যে আসলে কত বিশাল
অনুভূতি লুকিয়ে আছে আমি তা আগে জানতাম না, জেনেছি অনেক পরে। আমি বন্ধুত্বকে যা ভাবতাম তা আসলে শুধুই আমাদের চারপাশের সব মানুষের প্রচলিত কিছু বদ্ধমূল ধারণা ছাড়া আর কিছু না; আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী নিপা; প্রায়ই
আমাকে হাসতে হাসতে বলতো, বাংলাদেশে ছেলে মেয়েরা বন্ধু হতে পারেনা, কারণ; ছেলে মেয়ে বন্ধু হলেই আশেপাশের সবাই
তাদেরকে প্রেমিক প্রেমিকা ভাবা শুরু করে। তাদের বন্ধু বান্ধবরাও তাদেরকে খোঁচাতে শুরু করে। ছেলে মেয়ে বন্ধু হলে আমাদের পরিবারেরকিংবা সমাজের অনেকেই মেয়েটিকে ভালো চোখে দেখে না। ছেলের সাথে মেশার সময় মেয়ে মনে করে ছেলে মতলববাজ এবং ছেলে ভাবে মেয়েটি বেজায় চতুর। আমি কখনোই আসলে ওর মত করে ভাবতে বা দেখতে পারতাম না। বন্ধু বান্ধবআমার খুব বেশি ছিলো না। হাতে গোণা যারা ছিলো তাদের সাথে আড্ডা দিতাম, পড়তাম, সময় কাটাতাম, আর আমার বাকি সবকিছু জুড়ে থাকতো আমার ভালোবাসার মানুষ শাহেদ।
আমাদের তিন বছরের ভালোবাসার
সম্পর্কে আমি আমার সমস্ত অনুভূতি, আবেগ, স্বপ্ন,
এবং সময় মিশিয়ে দিয়েছিলাম। শুধু একটা সম্পর্ক
যে একজন মানুষের জীবনে এত পুর্ণতা; আর আনন্দ
আনতে পারে তা আমাকে দেখে যে কেউ
বুঝতে পারতো। কিন্তু সব ফুলের একদিন
ঝরে যেতে হয়, সব স্বপ্ন একদিন
ভেঙে গিয়ে বাস্তবতার আয়নায় সত্য তুলে ধরে।
আমার সাথেও তাই হয়েছিলো। আমার
ঝরে পড়া বকুলের সময় আমার দুঃখসাথী;
হয়েছিলো সাদি। টিএসির একদম
পেছনে পুরনো সুইমিং পুলের
পাশে বসে বসে আমি সেদিন চিৎকার করে কাঁদছিলাম।
সাদি পাথরের মত মুখ করে আমার পাশে বসেছিল আর
বার বার নিজের হাতের নীল রুমালটা দিয়ে চশমার কাঁচ
মুছছিলো। আমাকে সেদিন ও কোন সান্ত্বনা দেয়নি।
একবারও বলেনি সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি চিৎকার
করে কাঁদতে কাঁদতে একসময় ক্লান্ত
হয়ে ফোঁপাচ্ছিলাম, আমার গলা ভেঙে গিয়েছিলো,
চোখদুটো হয়ে গিয়েছিলো রক্তবর্ণ। ভার্টিসির দু'
একজন; ছেলে মেয়ে আমাদেরকে দেখেও না দেখার ভান
করে চলে যাচ্ছিলো, হয়ত ওরা ভাবছিলো আমি আর
সাদি প্রেমিক প্রেমিকা, নিজেদের মাঝে;
ঠুনকো ঝগড়ার কারণে মান অভিমান দেখাচ্ছি।
আমি সেদিন কিছুই ভাবার মত অবস্থায় ছিলাম না।
শুধু অনুভব করছিলাম আমাকে কাঁদতে হবে, অনেক
অনেক কাঁদতে হবে। আমার মনের মধ্যে কান্নার
সমুদ্র জমে আছে। না কাঁদলে আমি বাঁচতে পারবো না।
আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী এবং পৃথিবীতে আমার
সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষটি যে আমার অগোচরেই
একে অন্যের
সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যাবে তা কে জানতো?
কে জানতো এত কাছের দুজন মানুষকে হঠাৎ করেই
অনেক দূরের; কেউ হিসেবে আবিস্কার
করে আমি অদ্ভুত তীব্র এক কষ্টের শিকার হবো!
আমাকে আমার কোন সহপাঠির পাশে বসে আকুল
হয়ে কাঁদতে হবে। প্রতিবার আমার
মনে হবে আমি যা জেনেছি, যা শুনেছি তা ভুল। কিন্তু
পরক্ষণেই আমি আমার অনুভব করবো আমি অনেক
বড় কিছু হারিয়েছি, আমি বড্ড নিঃস্ব। -আম্মু
আম্মুগো, বাচ্চাদের মত
আম্মুকে ডেকে ডেকে ডুকরে কাঁদছিলাম আমি সেদিন;
সাদি একবারও আমাকে কান্না থামাতে বলছিলো না,
শুধু আমার কান্নার শব্দে তার চশমার কাঁচ পরিস্কার
করার ব্যস্ততা বাড়ছিলো।
আমার সাথে সাদি কথা বলেছিলো প্রায় দু দিন পর।
খুব সকালে ফোন করে বলেছিলো-
জানি রাতে ঘুমাওনি। তবে এইসব জেগে থাকা রাত
তোমাকে অনেক কিছু শেখাবে। তুমি দেখে নিও, একদিন
তুমি এই কষ্টের কথা ভুলে না গেলেও
নিজেকে সামলে নিতে পারবে। আমি ওর এই
কথাগুলো শুনেও ঝরঝর করে কাঁদছিলাম। নিপা আর
শাহেদ ক্যাম্পাসে আমার সামনে ঘুরে বেড়াবে,
আমাকে একলা ফেলে চলে যাওয়া দুটো মানুষ
একসাথে থাকবে, আমাকে দেখেও না দেখার ভান
করবে যেন আমি কখনো ওদের কেউ ছিলাম না।আমার
তিনটি বছর ধরে বুনে চলা ভালোবাসার ঘরে আমিই
আর নেই, এসব; কিছু আমি মানতে পারছিলাম না।
আমি অসহায়ের মত শুধু কাঁদছিলাম। আমাকে কিছুক্ষণ
কাঁদার সময় দিয়ে সাদি তখন নরম গলায় বলেছিলো,
একদিন তোমার খুব সুন্দর একটা জীবন
হবে দেখো নীরা, তোমার স্বামীটা হবে বড়
ভালোমানুষ, অসম্ভব মায়াকারা চেহারার বাবু
হবে তোমার। তুমি ভেবো না এত। শাহেদ আর নিপার
কথা ভেবে কষ্ট পেও না। আমার মা যখন বেঁচে ছিলেন
তখন তিনি বলতেন, মন ভাঙ্গা আর মসজিদ
ভাঙ্গা সমান অন্যায়। কারো মন ভেঙে কী কেউ
ভালো থাকতে পারবে বল? আমি ওর কথা শুনে একটু
পর পর নাক টানছিলাম আর মনে মনে ভাবছিলাম,
আমি কিচ্ছু চাই না জীবনে। কাউকে চাই না।
আমাকে শুধু কেউ এই তীব্র কষ্টটুকু ভুলিয়ে দিক। এই
সময়টুকু পার হয়ে যাক। আমার স্মৃতি থেকে কেউ এই
ঘটনা আর বেদনাগুলো মুছে ফেলুক। কেউ
করুণা করে হলেও মুছে ফেলুক।
মানুষ যা ভাবে তা বেশিরভাগ সময়ই হয় না। মানুষের
জীবনে আনন্দের সময়ের ব্যপ্তি হয় অল্প, আর
বেদনার সময় হয় দীর্ঘ। তাই আমার স্মৃতিগুলোও
মুছে যায়নি। আমার বেদনাও না। আমি প্রতিদিন ঘুম
থেকে উঠে ক্লাসে যেতাম আর অন্যমনস্ক
হয়ে থাকতাম, পৃথিবীর সকল খাবারের স্বাদ আমার
কাছে বিস্বাদ লাগতো। আমার পাশ
দিয়ে যাওয়া মানুষ, গাড়ি কোন কিছুর প্রতিই আমার
খেয়াল থাকতো না। আমাকে নিয়ে রাস্তা পাড় হত
সাদি। কবির সুমন বা হেমন্তের গানের
সিডি কিনে দেওয়া, অদ্ভুত সব অচেনা কবির কবিতার
বই কিনে দেওয়া কিংবা কলাভবনের সামনে দিয়ে একই
পথে বিনা কারণে আমাকে নিয়ে চুপচাপ হেঁটে যাওয়ার
কাজগুলো ও করতো বেশ সাবলীলভাবে। আমার তখন
আসলে কোন কিছুর প্রতিই কোন ভ্রুক্ষেপ
ছিলো না। আমি গান শুনতাম, কিন্তু কোন গান
শুনছি তা বলতে পারতাম না, বইয়ের পাতা খুলে উদাস
হয়ে থাকতাম, কম কথা বলতাম, সবসময় চুপ
করে থাকতাম আর একটু পর পর গভীর দীর্ঘশ্বাস
ফেলতাম। সাদি আমার সাথে থেকে যেত আমার ছায়ার
মত।
কে তাকে বলেছিলো এভাবে থাকতে তা আমি জানি না,
কেনই বা সে এত আন্তরিকতা নিয়ে আমার সব
ব্যাপারে সাহায্য করতো তাও ছিলো আমার অজানা।
আমি শুধু কুয়াশার মত অদ্ভুত কিছু ভাবনার
চক্রতে ঘুরপাক খেতাম।
সাদি যে মেয়েটিকে ভালোবাসতো, সেই
মেয়েটি ভার্সিটি ফার্স্ট ইয়ার শেষ
করতে না করতে দেশের বাইরে স্কলারশিপ
নিয়ে অনার্স পড়ার সুযোগ পেয়ে যায়। দেশের
বাইরে গিয়ে আর সাদির সাথে কোন যোগাযোগ
রাখে না। মাইলের দূরত্ব; যে আসলে সম্পর্কের
দুরত্বও বাড়িয়ে দেয় সাদির সম্পর্কের
পরিণতি দেখে আমরা সবাই তখন বুঝেছিলাম। সাদির
ভালোবাসা অবশ্য মাইলের দূরত্বের; কাছে পরাজয়
মানেনি। বরং সময়ের সাথে সাথে মেয়েটির প্রতি তার
আবেগ বেড়েছিলো। আমার কেন যেন মনে হত
সাদি বিশ্বাস করে হুট করেই একদিন মেয়েটি তার
সামনে এসে হাজির হবে আর রুপকথার গল্পের মত সব
ঠিক হয়ে যাবে। আমি যেমন মনে মনে বিশ্বাস করতাম
শাহেদ আমার কাছে ফিরে আসবে, কিংবা নিপার আর
আমি আবার আগের মত বন্ধু হয়ে যাবো। কোন এক
অদ্ভুত শক্তি এসে আমার জীবনের এলোমেলো সব
পাতাগুলো গুছিয়ে দিয়ে যাবে।
আমার ঘরের ছোট্ট জানালার সামনেই
ছিলো একটা নারকেল গাছ, গভীর রাতে বাতাসে যখন
সেই গাছের পাতা দোল খেত, আমার বুকের
কষ্টগুলো তখন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে যেত।
আমি নিঃশব্দে কাঁদতাম। আমার মনে হত
একসাথে স্কুলে পড়ার সময় আমি আর নিপা কতদিন
সবুজ রঙের ললি আইসক্রিম খেয়ে জিভ রঙ করেছি,
আমার মনে হত একটা সময় ছিলো যখন অনেক
রাতে আমি দুঃস্বপ্ন দেখে ভয় পেলেই শাহেদকে ফোন
করতে পারতাম, এরপর আমি না ঘুমানো পর্যন্ত
শাহেদ আর ফোন রাখতো না। ঘুমন্ত আমার
নিঃশ্বাস শুনেই কেবল ও ফোনের লাইনটা কাটতো।
এইসব ভেবে আমার বুকটা ব্যথায় চিনচিন করতো।
আমি ভাবতাম, এই গভীর রাতে, এই সময় কী নিপা আর
শাহেদ ফোনে কথা বলছে, স্বপ্ন বুনছে সংসারের?
কিংবা আগামী দিনগুলোর কথা ভেবে কী গল্প
করছে একে অন্যের সাথে? আমার
ভাবনাগুলো আমাকে আরো দুমড়ে মুচড়ে ফেলত। রাত
যত গভীর হত আমার কষ্টের পরিমাণ তত বাড়তো।
শুধু মাত্র ভোর হতে দেখলেই আমার
মনে হতো আমার কষ্টের
কালো ছায়াটা বুঝি হালকা হয়ে যাচ্ছে।
আমি সকালে ভার্সিটি গিয়ে ঘুমহীন চোখ আর
শুকনো মুখ নিয়ে সাদির সামনে দাঁড়াতাম।
সাদি আমাকে এক পলক দেখে হালকা গলায় বলতো,
এসো কোথাও বসে নাস্তা করি। আমি শুষ্ক
স্বরে বলতাম, ক্ষুধা নেই। ও তখন নির্বিকার
ভাবে বলতো, ঠিক আছে খেও না। আমিও
খাবো না তাহলে। এমনিতেও গতকাল দুপুরের পর
থেকে কয়েক কাপ চা ছাড়া কিছু খাওয়া হয়নি।
ক্ষুধা মরে গেছে আমার। আমি তখন ভীষণ বিব্রত
হয়ে তড়িঘড়ি করে বলতাম, আসলে আমার বেশ
ক্ষুধা পেয়েছে, চল চল কোথাও গিয়ে বসি। সাদি মৃদু
হেসে হাঁটতে শুরু করতো। সাদি বুদ্ধিমান ছিলো,
সে জানতো কীভাবে কোন কিছুতে আমাকে ব্যস্ত
করে ফেলা যায়। আমি ছিলাম বোকা আর আবেগী।
সবসময় বিষণ্ণ থাকতাম, শুধু কোন কাজ বা কোন
কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকার সময়টুকুতে শুধু স্বাভাবিক
হতে পারতাম।
এর মাঝে একদিন নিপার কথা সত্যি হয়ে গেলো।
ভার্সিটির অনেকেই কানাকানি শুরু করে দিলো আমার
আর সাদির মাঝে প্রেম চলছে,
আমরা নাকি একে অন্যকে ভালোবাসি!
আমি সহপাঠিদের এইসব কথা শুনে সাথে সাথেই
শামুকের মত নিজেকে গুটিয়ে ফেললাম। সাদির
সাথে কথা বলি না, ওর পাশে বসি না, ওর চোখে চোখ
পড়লে দ্রত অন্য দিকে তাকিয়ে ফেলি। সব সময়
একটা আড়ষ্ট ভাব নিয়ে থাকি। কেমন যেন
একটা খচখচানি ভাব মনে কাজ করে। বেশ কিছুদিন
চলে যাওয়ার পর সাদি একদিন ক্লাসের পরে আমার
সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি চোখ নামিয়ে নিলাম।
সাদি আমার সামনে থেকে সরে না গিয়েই শান্ত গলায়
বললো- পৃথিবীতে অনেক ধরণের ভালোবাসা আছে,
পরিবারের জন্যে ভালোবাসা, জীবনের
জন্যে ভালোবাসা, দেশের জন্যে ভালোবাসা, নিজের
জন্যে ভালোবাসা, বন্ধুর জন্যে ভালবাসা। এই
ভালোবাসাটা কী খারাপ বা অন্যায়? তোমার
কী মনে হয় নীরা? আমি নিচু স্বরে বললাম- অন্যায়
হবে কেন? সাদি আগের মতই শান্ত গলায় বললো,
চা খেতে ইচ্ছে করছে খুব, খাওয়াবে? আমি মাটির
দিকে তাকিয়েই মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম।
টঙের দোকানের বেঞ্চিতে বসে চায়ের কাপে ছোট্ট
চুমুক দিয়ে সাদি সেদিন কিছুটা বিষণ্ণ গলায়
বলেছিলো, বহুল প্রচলিত বাবা, ছেলে আর গাধার
গল্পটা পড়েছ তুমি?
-কোন গল্পটার কথা বলছ?
-আমার বাবার কাছ থেকে শুনেছিলাম আমি সেই
গল্পটা। মানুষের লজিক
ছাড়া কথাবার্তা শুনলে আমি প্রায়ই সেই গল্পটার
কথা মনে করি।
আমি চুপ করে থাকলাম। সাদি হাত নেড়ে নেড়ে গল্প
বলা শুরু করলো-
একবার এক গাধা নিয়ে বাবা-ছেলে দু'জন
মিলে হাটে যাচ্ছে। বাবা ছেলেকে গাধার
পিঠে তুলে যাচ্ছেন। পথচারীরা বলল, "কি বেয়াদপ
ছেলে। বৃদ্ধ বাবা গাধা টানছে, আর নির্লজ্জ
ছেলেটা গাধার পিঠে। লজ্জা পেয়ে ছেলে নেমে যায়।
বাবাকে গাধার পিঠে তুলে দেয়। ছেলে গাধার
সামনে হাঁটতে থাকে। আবার পথচারীরা বলল,
"দেখো ছেলেটার বাবা কি নির্দয়? ছোট
ছেলেটা হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে আর বাবা গাধার পিঠে আরাম
করে যাচ্ছে"? এবার বাবা লজ্জা পেয়ে ছেলেকেও
এসে গাধার পিঠে সওয়ার হতে বলল। বাবা আর
ছেলেকে গাধার পিঠে উঠে যেতে দেখে পথচারীরা এবার
বলল, "দেখো দেখো, কি নির্মম বাবা-ছেলে? দু'জন
মিলে এক গাধার পিঠে উঠে যাচ্ছে"।
লজ্জা পেয়ে বাবা ছেলে দু'জনে গাধার পিঠ
থেকে নেমে হাঁটতে লাগল। এবার
পথচারীরা বাবা ছেলেকে দেখিয়ে বলল,
"দেখো কি গাধার গাধা? সাথে গাধা থাকতেও;
এরা দু'জন হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে"?
গল্প শুনে আমি মুখে হাত
চাপা দিয়ে নিঃশব্দে হেসে ফেললাম। সাদি কথা বলেই
যাচ্ছে, তার মানে কী দাঁড়ালো বুঝতে পেরেছ?
আমরা যত যাই করি না কেন, যেমনই থাকি না কেন,
মানুষের মুখ থেমে থাকবে না। যাদের যা বলার
তারা তা বলবেই। তাই এসব কথায় কান দিতে নেই।
তুমি ক্লাসের সবার কথা শুনে মন খারাপ করেছ কেন?
ওদের কী ধারণা আছে তোমার সাথে আমার
কী নিয়ে কথা হয়, কী কথা হয়, আমি কেমন,
তুমি কেমন কতটুকু জানে ওরা? না জেনে কেউ কিছু
বলে ফেললো আর তাতেই তুমি সব কিছু বাদ
দিয়ে নিজেকে আড়াল করে ফেললে?
-আমার আসলে অনেক খারাপ লেগেছিলো, তাই
হয়তো... আমি কথা শেষ করতে পারলাম না।
-ভালোবাসা মানেই প্রেম না।
ভালোবাসা মানে অনেক বড় কিছু, অনেক উদার কিছু,
আমরা মানুষরাই শুধু এই বিশাল
অনুভূতিটাকে সংকীর্ণ; করে ফেলি। জানো আমার
একটা ডায়েরী ছিলো, সেই ডায়রীর নাম ছিলো-
“"দুঃখ ভালোবেসো”" আমার জীবনের দুঃখগুলোকেও
আমি ভীষণ ভালোবাসি। যারা দুঃখ
দিয়েছে তাদেরকেও......
আমি সব শুনে চুপ করে থাকলাম। মনে মনে বললাম,
আমি একজন দুর্বল মনের মানুষ। আমি দুঃখকে বড্ড
ভয় পাই। আমার কষ্ট হয় অনেক...
আমি আড়চোখে সাদির দিকে তাকাই, দেখি ও
আনমনা হয়ে চায়ের কাপে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে।
পৃথিবীর কোন কিছুই যে ওকে আঘাত করার
ক্ষমতা রাখে না ওর বসে থাকার নির্বিকার ভঙ্গী যেন
তাই বলে দিচ্ছে। হঠাৎ করেই আমি বুঝতে পারি আমার
সাথে সাদির সম্পর্কটা অদ্ভুত সুন্দর। আমি সেদিন
পুরনো একটা টঙের দোকানের
নড়বড়ে বেঞ্চিতে বসে থেকে অনুভব করতে পারি,
আমি দুর্বল হলেও আমার পাশে বসে থাকা শান্ত
চেহারার ছেলেটা দুর্বল নয় মোটেও।
এরপর অনেকদিন হয়ে গিয়েছে।
মেঘে মেঘে বেলা গড়িয়েছে। ভার্সিটি জীবন শেষ
প্রায়,এক ছুটিতে আমি গ্রামের
বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম। হেমন্তের এক স্নিগ্ধ
বিকেলে আমি আমার দাদু বাড়ির পুরনো ডুপ্লেক্স
বাসার ছাদের কার্ণিশে উবু হয়ে অনেকক্ষন
তাকিয়ে ছিলাম বাড়ির পেছনের শ্যাওলা পড়া দীঘির
দিকে। আকাশের সাদা সাদা মেঘগুলো দেখে আমার
মনে হচ্ছিলো আমি চাইলেই হয়ত
মেঘগুলোকে ছুঁয়ে দিতে পারবো, কিংবা চাইলেই
আমি বিকেলের মিষ্টি রোদটুকুকে হাতের মুঠোয়
বন্দী করতে পারবো। সেদিন বিকেলের রোদটুকু,
বাতাসটুকু, আকাশের মেঘগুলো আমাকে ভীষণ আনন্দ
দিয়েছিলো। আমি আনন্দিত ছিলাম নিজের
জীবনকে আমি আগের
চেয়ে স্বাভাবিকভাবে দেখতে পারি বলে। আমি গর্বিত
ছিলাম আমার জীবনে আমি আমার মত
করে বাঁচতে শিখেছিলাম বলে। আমার গ্রামের
বাড়িতে মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক ছিলো না, অথচ
আমার তখন সাদির সাথে কথা বলতে খুব
ইচ্ছে করছিলো। আমার সেদিনের অনুভুতিটুকু,
উপলব্ধিটুকু,আর আমার নিজের গল্পটুকু আমি তাই
জমিয়ে রেখেছিলাম ঢাকা ফিরেই সাদিকে বলবো বলে।
কিন্তু সাদি আমার গল্প শোনার জন্যে আর
অপেক্ষা করেনি। হেমন্তের
যে বিকেলে আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলাম, সেদিনই
সে বিদায় নিয়েছিলো পৃথিবী ছেড়ে। শুনেছি সেদিন
বিকেলে আকাশের অবাক করা রঙ তার নজর কেড়েছিল,
আনমনা সাদি দেখতে পারেনি কখন তার
সামনে বেপরোয়া বাস চলে এসেছে। প্রায় একদিন
হাসপাতালে থেকে সাদি হারিয়ে গেলো।
পৃথিবী ছেড়ে অনেক দূরে কোথাও চলে গেলো।
সাদি চলে গেলো নিঃশব্দে, সারা রাত ফুটে থাকার পর
খুব ভোরে যেমন করে কোন ফুল টুপ
করে ঝরে পড়ে ঠিক সেভাবে। বর্ষার
প্রথমদিনে আকাশ কালো করে যখন মেঘ হয় তখন
প্রথম যে বৃষ্টির ফোঁটা ধরণীকে;
আলতো করে আগে স্পর্শ করে নেয়,
সাদি চলে গেলো ঠিক সেভাবে। সাদির
জন্যে আমি কাঁদলাম না। কথায় আছে Friends
Never Die. বন্ধু কখনো মরেনা। আমি বিশ্বাস
করতাম সাদি আছে। হুট করে সে কোন একদিন আমার
সামনে এসে বলবে, নীরা খুব
চা খেতে ইচ্ছে করছে কিংবা অজানা কোন কবির
কবিতার বই দিয়ে বলবে, ১১২ নাম্বার পেইজের
কবিতাটা তোমার ভালো লাগবে খুব, আমি জানি।
আজও আমাদের ভার্সিটির ক্লাসমেটদের
পূর্নঃমিলনীতে; একটা আসন খালি রাখা হয়।
সাদি এসে বসবে তাই। সবার নানা রকম গল্প
শুনতে শুনতে সাদি মাঝে মাঝে নিজের নীল রঙের
রুমাল দিয়ে চশমার কাঁচ মুছবে আর আপনমনেই
হাসবে তাই।
সাদি চলে গিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তাকে অনেক মানুষ
পছন্দ করে। আকাশের অবাক করা রঙ সাদিকে নিজের
কাছে হয়ত নিয়ে গিয়েছে কিন্তু আমাদের কাছ
থেকে নিতে পারেনি।
জানো সাদি,
মাঝে মাঝেই আমার
জানতে ইচ্ছে করে ওখানে তুমি কেমন আছ? তোমার
নীল রুমালটা কি এখনো আছে? তোমার
দুঃখবিলাসি মন এখন কেমন আছে? অনেক দুরের
যে দেশে তুমি আছো, সেখানে কী ভীষণ নির্জন কোন
পথ আছে, সেখানে কী তুমি একা একা হেঁটে বেড়াও?
জানো! তোমার বলা কথাগুলো সত্যি হয়েছে, শাহেদ
আর নিপার সম্পর্ক আর শেষ পর্যন্ত টেকেনি। আর
আমার খুব সাদামাটা কিন্তু সুন্দর একটা সংসার
হয়েছে, আমার স্বামীটা বোকাসোকা কিন্তু একজন
ভালোমানুষ। বিয়ের পর একদিন রাতে তোমার
কথা বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলাম আমি,
তিনি তখন আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দীর্ঘক্ষণ;
বসেছিলেন। তোমার কথা শুনে, আমার দুঃখ
দেখে চোখ ভিজে এসেছিলো উনার। আমার পুতুলের
মত ফুটফুটে একটা মেয়ে হয়েছে। ওর নাম বুবলি। বয়স
আঠারো মাস। এখন অল্প অল্প কথা বলতে পারে।
“"র"” উচ্চারণ করতে পারে না ও "“র"”
কে বলে "“ল"”। আমি যদি ওকে প্রশ্ন করি- মামনি,
তুমি আমার হৃদয়ের কী? তাহলে ও একগাল
হেসে কী উত্তর দিবে জানো? “- "টুকলা"” । আমার
মেয়ে টুকরা বলতে পারে না। জীবন, সময় সব কিছু
আসলে আগের চেয়ে বদলে গেছে। তুমিও কী অনেক
বদলে গেছো সাদি? আমি কিন্তু এখনো আগের মত
কান্নাকাটি করি। মন খারাপ হলে কাঁদি, আমার
বুবলিটার কান্না দেখে যখন
ওকে থামাতে পারি না তখন নিজেই কেঁদে ফেলি।
মাঝে মাঝে আবার ছাদের কার্ণিশের
পাশে বসে একা একাই কাঁদি। কাঁদলে হালকা হয়ে যায়
মন। আবার
কখনো যদি মনে ভালো থাকে তাহলে গুনগুন করে গান
শোনাই বুবলিকে-
আজ খেলা ভাঙ্গার খেলা,
খেলবি আয় আয় আয়
সুখের বাসা ভেঙ্গে,
খেলবি আয় আয় আয়......।।
তুমি বলেছিলে ভালোবাসা অনেক রকম হয়।
আমি তখন এই কথাটার অর্থ বুঝতাম না, এখন বুঝি।
বন্ধুর জন্যে ভালোবাসার কথা বলেছিলে তুমি,
আমি এখন বুঝি। আমি এখন প্রতি বছর হেমন্তের
স্নিগ্ধ বিকেলের পেঁজা তুলোর মতো মেঘময়
আকাশের জন্যে অপেক্ষা করি। শেষ বিকেলের কোন
এক অদ্ভুত আলোর জন্যে অপেক্ষা করি। আমার কেন
যেন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় এমন কোন
বিকেলে তুমি আসবে। আমি আমার
বাবুটাকে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তোমার
জন্যে অপেক্ষা করবো। আমাদের
দেখে হয়তো তুমি কিছুই বলবে না, কিন্তু
আমি অনুভব করতে পারবো তুমি আমাদের দেখছো।
অন্য এক ভুবনে থেকেও কাছেই আছ... খুব কাছে...
আমাদের খুব কাছে ছায়া হয়ে থাকার মত করে......
গল্প : একুয়া রেজিয়া
.jpg)
No comments:
Post a Comment