Saturday, June 20, 2015

রাজকন্যার বিদায়বেলা....

বিছানায় এপাশ থেকে ওপাশ করছে ঝিনুক। একদম ঘুম আসছেনা। জানালায় তাকিয়ে আছে অপলক। নাহ, ঘুম আসছেনা। মাথায় চেপে গেল প্রতিদিনের দুষ্টামি। রাত ৩টা বেজে ১০ মিনিট! ঝিনুক পা টিপেটিপে বাবার ঘরে প্রবেশ করলো। নাহ, শব্দ করা যাবে না। আজকের মজার বিষয় আলাদা। গিয়ে চুপিচুপি বাবার বুকের উপর মাথা দিয়ে দশ মিনিট শুয়ে থাকতে হবে। বাবা টের পেলে খেলা ভন্ডুল। পা টিপেটিপে ধীরে ধীরে বাবার কাছে চলে গেলো। আলতো করে মাথাটা রাখলো বাবার বুকে! আহা কি শান্তি। শহরের নামকরা উকিল মি. কল্যাণ সাহা এখন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ঝিনুক চোখ বন্ধ করে ফেললো। কি শান্তি! দশমিনিট হয়ে গেছে এখন উঠতে হবে। বাবা টের পেলে সব্বনাশ হবে।এত রাতে আসার জন্য বকাতো দিবেই শাস্তিও দিবে। আসতে আসতে বিছানা থেকে নেমে
যাবার সময় খট করে ঝিনুকের হাত ধরে ফেললো বাবা। বুকটা কেঁপে উঠলো যেন “কিরে দুষ্টু ভেবেছিস আমি টের পাবো নাহ? বাবার সাথে দুষ্টুমি” হিহিহি করে হাসিতে রাত কেঁপে উঠবার জোগাড়।
-তা রাতে ঘুমাসনি কেনরে?
-তোমার বুকে ঘুমুতে ইচ্ছা করছে যে! তাই
ঘুম ভেঙ্গে গেল।
-তুই না বড় হয়েছিস? বিয়ে করলে কি করবি?
-ধুর! ওসব পঁচা ব্যাপার আমি করবো না।
বাবা হো হো করে হাসি দিলেন।“আচ্ছা বাবার বুকে ঘুমা,আমার আবার সকালে উঠে অফিসে যেতে হবে”।
ঝিনুক নিমেষেই ঘুমিয়ে পড়লো।

সকাল ৯টা, মোবাইলে এলার্ম কর্কশ স্বরে বাজছে। ধুর বলে চোখ খুলে দেখলো বিছানায় বাবা নাই। কোচিংয়ে যেতে হবে। ফ্রেশ হবার জন্য উঠে গেল বিরক্ত হয়েই। সারাদিন দুষ্টামি করেই কেটে যায় ঝিনুকের। দেখে বোঝার উপায় নেই মেয়ে এখন বড় হয়েছে। 

চলতে থাকা আরেক রাত, সময় ২টা বেজে ১৯ মিনিট!
আজ কিছুতেই ধরা পড়া যাবে না। কিছুতেই না।বাবার ঘুম ভারি কানের কাছে গিয়ে মিউ মিউ করলে কেমন হয়? নিজের বুদ্ধিতে নিজেই খুশী ঝিনুক।ডিম লাইটের হাল্কা নীল আলো জ্বলছে। বাবা ঘুমাচ্ছে রীতিমত নাক ডেকে। আজকে আর টের পাবা না! এই বলেই মিউ মিউ করা শুরু করলো। খাটের পাশে বসে আরও দুবার মিউমিউ করে ডাক দিলো ঝিনুক।
কল্যাণ বাবু হতচকিত হয়ে “বিড়াল বিড়াল” বলে উঠে বিছানায় বসে গেলেন। এদিকে ফ্লোরে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে  ঝিনুক।
“তবেরে তুই আজকেও আমার ঘুম নষ্ট করছিস,তোকে আজ আমি মাছ খাইয়ে দিবো। বিড়াল সাজছিস না” হাসি যেন থামে না ঝিনুকের।
“বাবা আমি মাছ খাই না, আমাকে একটা চুমু দাও”। কপোট রাগে কল্যাণ বাবু বললেন “না তোর জন্য চুমু নাই কাঁচা মাছ
খাওয়াবো, আমারে ঘুমের ডিষ্টার্বের শাস্তি”। ঝিনুক আবার হিহিহি করে হাসতে লাগলো “বাবা আমাকে কিনে দিবা?
-হাহাহা দিবো দিবো,
-তুমিতো ব্যস্ত কালকেই দিতে হবে কিন্তু!
-আচ্ছা কালকেই দিবো এখন যাও ঘুমাও। আমার সকালে অফিসে যেতে হবে তো।
- যাচ্ছি, কপালে চুমু খাও আগে। নইলে যাবো না।
বাবার চুমু নিয়ে ঝিনুক নিজ রুমে নাচতে নাচতে চলে গেল।

পরেরদিন বিকালে.....
একুরিয়ামের নাক ঘেষে বসে আছে ঝিনুক। ভিতরকার জোড়া গোল্ডফীশ যেন নাক খাবার প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দিয়েছে।
কি মজা! ঝিনুক নাকটা বারবার স্থান পরিবর্তন করছে গোল্ডফীশ জোড়াও সেদিকেই ছুটছে। কি লোভী গোল্ডফীশরে বাবা।
ঝিনুক
মা ডাকছে।
-কি মা?
-নুডুলস খাবি আয়
-না মা আমি গোল্ডফীশ খাবো,পেঁয়াজ দিয়ে ভুনা করবা। এরা খুব লোভী। আমার নাক খেতে চাইছে।
ও পাশ থেকে হাসির শব্দ শোনা গেল।
ঝিনুক একটু মুখ বাঁকালো। তারপর আবার গোল্ডফীশের সাথে নাক নাক লোভ খেলা শুরু করলো। বাবা আসলে বলতে হবে “তোমার গোল্ডফীশগুলো ভালো না,পঁচা।আমার নাক খেয়ে ফেলতে চায়। ওগুলা আমি ভুনা করে খাবো। মা ভুনা করে দিচ্ছে না”
কলিং বেল বাজলো! ধুর টিচার আসছে 
!

চলতে থাকা আরেক রাত, সময় পৌনে তিনটা ! হ্ঠাৎ কেন জানি মোবাইলটা হাতে নিল ঝিনুক। আজ অনেকদিন হয়েছে ওর ফোন আসেনা। খুব অন্যায় হয়ে গেছে ওর সাথে। ঝিনুক অনেক ভালবাসে ছেলেটাকে। কিন্তুু বাবার জন্য সেই ভালবাসা বিসর্জন দিতে এতটুকু বুক কাপেনি। বাবাই যে সব তার জীবনে। ঝিনুক খুব ভাল করেই জানে ছেলেটা এখনো নির্ঘুম রাত কাটায় শুধুমাত্র তারই জন্য। তারই অপেক্ষায়। এসব ভাবতে ভাবতে চোখের কোনে জমা হওয়া একফোটা জল আপন পথে গড়িয়ে পরে গেল। বিছানা থেকে উঠে চোখ মুছে বাবার রুমের দিকে তাকালো ঝিনুক। আজকের কাজ সবচেয়ে মজার এবং রোমহর্ষক। একুরিয়ামটা হাতে নিয়ে বাবার কাছে দাড়িয়ে থাকবে ঝিনুক। বাবাকে প্রথমে নিচু গলায় ডাকবে,বাবা শুনবে না। তারপর গলার স্বর একটু বাড়াবে। তাতেও বাবা শুনবে না। তারপর একবারে চিৎকার করবে “বাবাআাআঅ বলে” তখন বাবা ধড়ফড় করে উঠে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হতভম্ব হয়ে যাবে। ঝিনুক হেসে লুটোপুটি খাবে। হাতে একুরিয়াম নিয়ে একদম বাবার বালিশের পাশে দাড়ালো ঝিনুক। নীলচে আলোতে গোল্ডফীশগুলো বেরিয়ে আসত। ঝিনুক আলতো করে ডাক দিলো “বাবা”। কল্যাণ বাবু ঘুমাচ্ছেন। আবার ডাকলো “এ্যাই বাবা” ! কল্যাণ বাবুর নাক ডাকার স্বর কিঞ্চিত বাড়লোবই কমলো না। এবার ঝিনুক এ্যাকশনে গেল “ওই বাআবাআআ…..” কল্যাণ বাবু পড়িমরি করে বিছানায় উঠে বসলেন। ঝিনুক হেসে লুটোপুটি খেতে লাগলো। কল্যাণ বাবু হতভম্ব চেহারা এখনও ঠিক হয়নি।ওদিকে হেসেই চলেছে ঝিনুক। হাসতে হাসতে হাত ফসকে একুরিয়াম ঠাস !! পুরো বাড়ী চুপ।
-ফাজিল মেয়ে কোথাকার! প্রতিরাতেই এসব করে। কদিন পরেই ভার্সিটিতে ভর্তি হবে,অথচ এখনও সেই বাচ্চা রয়ে গেছে। বাবার রাগে তাল সামলাতে পারেনি ঝিনুক। ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো। বাবা পড়লেন বিপদে। মেয়ের মাথায় হাত বুলান,গালে আদর করে দেন,কপালে চুমু খান কিছুতেই কিছু হয় না।
-যাও মা ঘুমিয়ে পড়ো, বাবা সকালে অফিসে যাবো।
-না, তুমি আমার একুরিয়াম নষ্ট করছো। আমাকে কিনে দিবা। কালকেই কিনে দিবা
-আচ্ছা মা দিবো!
-নাহ! আমরা জন্য এক জোড়া এঞ্জেল ফিশ কিনে আনবা।
-আমিতো মা ওসব চিনিনা,আচ্ছা অফিস থেকে এসে তোমাকে নিয়ে যাবো। তারপর এঞ্জেল ফিশ কিনে আনবো। এবার ঘুমাবে?
-না
-আবার কি?
-আমাকে রুমে দিয়ে আসো, একা ঘুমাতে ভালো লাগেনা।
-আচ্ছা পাগলী মেয়ে। চলো।
আবার সেই সকালের বিচ্ছিরি এলার্ম সাউন্ড।
মোবাইলটাকে আছাড় মেরে ভেঙ্গে ফেলতে ইচ্ছা হচ্ছে। কিন্তু কোচিংয়ে যেতে হবে। কত কাজ। ধুর...

চলতে থাকা আরেক রাত! সময় ৩টা বেজে ৪৯ মিনিট! আজ বাবাকে একদম ডিষ্টার্ব করবে না ঝিনুক। কেবল বাবার খাটের চারপাশে হাঁটাহাঁটি করবে,পুরো ঘরে হাঁটা পা টিপেটিপে অন্য দিনের মতই রুমে প্রবেশ করলো। খাটের চারপাশ ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলো ঝিনুক। একটু ঘুমঘুম পাচ্ছে,ওয়্যারড্রপের উপর বাবার মোবাইল। দুষ্টুমি মাথায় খেলে গেল। বাবার মোবাইল থেকে বন্ধুকে মিসডকল দিবে,বন্ধু পরদিন ব্যাক করলে বাবার ঝাড়ি খাবে। কি মজা! যেই ভাবা সেই কাজ।কাজ শেষ করে মোবাইল জায়গা মতই রাখলো। পুরো ঘরে হাঁটতে হাঁটতে জানালার পাশে থমকে দাড়ালো ঝিনুক। জানালা দিয়ে পাশের মাঠ দেখা যায়। বিকেলে লোকজন ভরতি থাকে অথচ এখন কত নীরব।নাক ডাকার শব্দে বিছানার দিকে তাকালো বাবা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। ভীষন ইচ্ছা করছে বাবার বুকে লাফ দিয়ে ঘুম ভাঙ্গাতে। না আজকে থাক। হঠাৎ দেয়াল ঘড়ি ধুম করে শব্দ করে উঠলো! ৪ টা বাজার সংকেত দিলো। 
১ বছর পর.....
আজ ঝিনুকের বিয়ে। সারা বাড়ি আলোকসজ্জায় জ্বলজ্বল করছে। ঝিনুকের দু চোখেও পানি জ্বলজ্বল করছে। কাল থেকে তার রাতের সঙ্গী হবে আরেকজন। কাল থেকে বাবাকে আর কেউ জ্বালাবেনা। মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে কেউ দুষ্টামি করবেনা। বাবার  বুকে মাথা রেখে আর কেউ ঘুমাবেনা। নতুন বউ সেজে চুপটি করে বসে অবিরাম চোখের জল ফেলছে ঝিনুক। 
বাবার রাজত্বে আজ রাজকন্যার শেষ দিন!

নিজের রুমে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন কল্যাণ বাবু। চোখজোড়া বন্ধ। কি যেন ভাবছেন। আচমকা বাবা ডাকে চোখ খুলে দাড়িয়ে পড়লেন কল্যাণ বাবু। রুমের লাইট জেলে দেখলেন কেউ নেই। তাহলে কি !! কি একটা অদ্ভুত আবেগের টানে বুকটা ছিড়ে যাচ্ছে তার। হঠাৎ দেয়াল ঘড়িটা ধুম করে শব্দ করে উঠলো! ৪টা বাজে। দেয়াল ঘড়ি ঘোর বুঝে না, কেবল সময় জানিয়ে দেয়। মেঝেতে পড়ে থাকলেন কল্যাণ বাবু। দেয়াল ঘড়ি তখনও নিথর সময় বাতলে যাচ্ছে।

গল্প:- শঙ্খনীল 

No comments:

Post a Comment