মাঝে মাঝে আবার মরে যেতে ইচ্ছে হয় মোহনার। ইচ্ছে হয় এই নষ্ট সমাজ,
চারদিকের মানুষদের নষ্ট দৃষ্টি আর অশ্লীল ভাবনার উপলক্ষ্য হয়ে বেঁচে থাকার
চেয়ে মরে যাওয়াটাই উত্তম। এক সময় মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকাটা
ভীষণ জরুরি হয়ে পড়েছিল। আর তাই তো যাবতীয় কষ্ট-অপমানের তীব্র যন্ত্রণাকে
উপেক্ষা করে পার করেছে দিন-রাত, সপ্তাহ-মাস, বছর-যুগ। এখন হয়তো আর ততটা
জরুরি নয় বেঁচে থাকা।
যার জন্যে কষ্টকে কষ্ট মনে করে নি, নিদারুণ অপমানের তীব্রতায় বুক ফেটে কান্না এলেও তা গিলে ফেলে বজায় রেখেছিল হাসি হাসি মুখ, তার কাছেই আজ হতে হচ্ছে নানা জিজ্ঞাসায় জর্জরিত। কেন? এসবের কি প্রয়োজন ছিল আদৌ, সেধে সেধে নিজের জন্যে আকাশ ছোঁয়া দামে এত যন্ত্রণা কেনার? অথচ সময় তো পৌঁছে গেছে তার গন্তব্যে। তাকে কি আর ফেরানো যাবে? কোনো মূল্যেই ফেরানো যাবে না বিগত সময়গুলোকে। তার চেয়ে বরং নিজেই সময়ের অতীত হয়ে যাওয়া হয়তো সব দিক থেকে উপযুক্ত।
হঠাৎ হালকা ঘূর্ণি হাওয়ায় জানালার পর্দাটি দুলে উঠলে মুহূর্তেই বাইরে চলে যায় মোহনার দৃষ্টি। রাত-প্রহরী কিশোরটি আজও তার জন্যে নির্দিষ্ট জায়গাটিতে ঠায় বসে আছে সতর্ক দৃষ্টি মেলে, পাছে সামান্য অসতর্কতায় কোনো চতুর ঢুকে পড়ে কিনা কোনো অসাধু উদ্দেশ্য নিয়ে। অবশ্য প্রায়ই মাঝ রাতে শোনা যায় তার প্লাস্টিক কিংবা ধাতব বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে তীক্ষ্ণ শব্দে রাতের নীরবতাকে হরণ করতে। কখনো কখনো নিজেকেই যেন সেই কিশোরটির মতো মনে হয় যার কাঁধে চেপে আছে মহামূল্য সম্পদ কিন্তু প্রাপ্তি অথবা ভোগের ক্ষেত্রে প্রায় শূন্য। এই যে জননী হিসেবে বছরের পর বছর আত্মজার পেছনে ব্যয় করেছে অগণিত মুহূর্ত তার সবই যেন মূল্যহীন হয়ে গেল সামান্য কয়েকটি কথাতে। টুসি যখন বলছিল, তোমার কারণেই তো আব্বুকে কাছে পাই না। তুমি কেন আমাকে জোর করে তোমার কাছে রাখলে?
তখন মস্তিষ্কের যাবতীয় ভাবনা বা উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী কোষগুলো যেন স্থবির হয়ে পড়েছিল মুহূর্তকালের জন্যে। কেমন দিশেহারা মনে হচ্ছিল নিজেকে। সে যেন বোধ-বিবেচনার অতীত হয়ে গিয়েছিল তখন। মেয়ের মুখে এমন কথা শুনতে হবে, ব্যাপারটা কখনোই তার ভাবনাতে উঁকিঝুঁকিও দেয় নি কোনোদিন। অথচ কেমন অবলীলায় কথাগুলো বলে ফেলেছিল টুসি। একবার মনে হয়েছিল যে, আগে বড়দের কারো মুখ থেকে শুনেছিল কোনোদিন তাই হয়তো স্মৃতি থেকে প্রসঙ্গক্রমে উগড়ে দিয়েছিল মাত্র। কিন্তু হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে গিয়েছিল, সপ্তাহ দুয়েক বা মাস খানেক আগে হঠাৎ করেই পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠে এসে গলা জড়িয়ে ধরেছিল টুসি। সে অবাক হয়ে কন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে ঘটনার অন্তরালের ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করছিল আর তখনই আদুরে গলায় বলে উঠেছিল সে, তুমি শুধুই আমার একার আম্মু হয়ে থাকো। আর কারো কিছু হতে হবে না।
টুসির কথার ভেতর এতটাই সূক্ষ্ম অথচ ভয়াবহ একটি দাবি প্রচ্ছন্ন ছিল যা সঙ্গে সঙ্গেই ধরতে পারে নি মোহনা। পরদিন টিচার্স কমন রুমে অফ পিরিয়ডে বসে বসে পত্রিকার পাতা ওলটাতে ওলটাতে অকস্মাৎ তার ভাবনায় খেলে গিয়েছিল টুসির কথার অন্তর্নিহিত রহস্যটি। সেই সঙ্গে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল টুসির গোপন জগতটি। যেখানে আর কারো উপস্থিতি তার সহ্য হবে না বা মেনে নেবে না তার বাবার আসনের বিচ্যুতি। আর টুসির প্রচ্ছন্ন দাবিটুকুর নানা দিক ভাবতে ভাবতে ভেতরে ভেতরে এতটাই গুটিয়ে যাচ্ছিল যে, ঠিক প্লাস্টিকের কিছু পুড়তে থাকলে তা গুটিয়ে যেতে যেতে আকারও বদলাতে থাকে চার পাশ থেকে। ইংরেজির টিচার সুরাইয়া তা দেখতে পেয়েই যেন বলে উঠেছিল, তোমার কি খারাপ লাগছে আপা? প্রেশারটা কি আবার…
সুরাইয়া কথা শেষ না করলেও মোহনা বলেছিল, না। তেমন কিছু না। বলতে বলতে মাথা নেড়েছিল। তারপর স্কুল ছুটির পর সরাসরি বাসায় না ফিরে চলে গিয়েছিল টুসির স্কুলে। ছুটি হতেই বাইরে বেরিয়ে মাকে দেখতে পেয়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো ছুটে এসে কোমর জড়িয়ে ধরেছিল টুসি। মেয়ের এমন খুশি হওয়াটা সে দেখতে চায় সেদিনই যেদিন চারদিকের অন্ধকারেরা হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে ক্রমশ তাকে কোণঠাসা করে ফেলতে চায়।
মোহনা সেদিন বন্ধুর মতো বা ঠিক টুসির বয়সের সঙ্গে মিশে গিয়ে আবিষ্কার করতে চেষ্টা করেছিল তার মনের আভ্যন্তরীণ দিকটা। আর অবাক-বিস্ময়ে আবিষ্কার করতে পেরেছিল সেখানে মাশুক ছাড়া আর কেউ নেই। এমন একটা বাচ্চা মানুষ মনের এতটা গভীরে তার জন্মদাতাকে অনুভব করে যার যোগ্যতার ছিটেফোঁটা মাশুকের মাঝে নেই।
একবার মনে হয়েছিল দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষার কথাটি। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাতিল করে দিতে হয়েছিল ভাবনাটিকে। টুসি ছেলেমানুষ। ক্লাস সেভেনের একটি মেয়ে জগত-সংসার বা স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের কতটুকুই আর বোঝে! তার পরও ভাবনাটির কুটো-কাঁটা যেন মনের ভেতরকার হাজারো কাজের অকাজের ভাবনার ফাঁক-ফোকরে কোথাও আটকে ছিল হয়তো। নৈঃসঙ্গ্য আর রাতের নৈঃশব্দ্যের সুযোগে কখন পরিপূর্ণ হয়ে ভাবনাটি ফের সচল হয়ে উঠেছে টের পায় নি মোহনা। থেকে থেকেই নানা জিজ্ঞাসার রূপ ধরে হাওয়ায় ভাসমান পরিত্যক্ত হালকা পালকের মতো মনের এখানে সেখানে উঁকি দিয়ে যাচ্ছিল বারবার।
আচ্ছা, তাহলে কি ভুলই করল সে? যে সন্তান তার পিতার সান্নিধ্য কামনা করে প্রবল ভাবে, তাকে কি এভাবে বঞ্চিত করা ঠিক হয়েছে? বঞ্চিতই বা সে করছে কীভাবে? পিতা হিসেবে তো মাশুকের কম বেশি দায়-দায়িত্ব আছে কন্যার প্রতি। কিন্তু তা কি সে পালন করছে ঠিক মতো? নাকি খোঁজ-খবর করে নিয়মিত? টুসিকে কে বোঝাবে তার পেছনে যা খরচ হচ্ছে বা সে এ পর্যন্ত বড় হয়ে বাপের পক্ষে যে ওকালতি করে, তার জীবনে কেবল জন্ম দেওয়াটা ছাড়া বাপের কোনো অবদান নেই? আর সে কথা বোঝাতে গেলেও বাপ-ভক্ত কন্যার চোখ ছলছল হয়ে ওঠে সব সময়। সে যে বাপের বিপক্ষে কোনো যুক্তি শুনতে বা বুঝতে চায় না ইচ্ছে করেই, তাও গোপন থাকে না তার নীরবতায়। আসলে বাপ যে তাকে কতটা অবহেলা করে তা তার বোধে নিজ থেকে কোনোদিন না জাগলে বলে কয়ে তা জাগানো অসম্ভব। আর তা সম্ভব নয় বলেই, সে চেষ্টাও সে বাদ দিয়েছে অনেক কাল আগে। কিন্তু তবু তো এতটা ব্যয় দেবার পরও গর্ভ-নিঃসৃত কন্যার চোখে নিজেকেই অপরাধী সাব্যস্ত হতে হলো শেষপর্যন্ত। কী প্রয়োজন ছিল এ সবের?
নিজেকেই যেন সান্ত্বনা দেওয়া নানা জিজ্ঞাসার আড়ালে। সে যদি নিজের সিদ্ধান্তে অটল না থেকে মাশুকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করতো, প্রতিদিনের যন্ত্রণাগুলোকে যদি অন্যান্য মেয়েদের মতো সবার দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রাখতে চেষ্টা করতো, পশুর সমপর্যায়ে নেমে গিয়ে যদি সব কিছু মেনে নিতে পারতো মুখ বুজে কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে আবিষ্কার করে নিতে পারত বিকল্প স্রোতের মাঝে কিছুক্ষণের জন্যে ভেসে চলার বিবিধ পন্থা, এমন নষ্ট-ভ্রষ্ট হয়ে মালিনী অথবা পাপিয়ারা যেমন বেশ আছে বলে দাবি করে, তাহলে হয়তো আজ তাকে বিরূপ কিছু শুনতে হতো না। পাড়া-পড়শি আত্মীয়-স্বজন থেকে আরম্ভ করে নিজের ঘরেই শিকার হতে হতো না বাঁকা দৃষ্টির। জন্মদাত্রীর মুখে সম্বোধিত হতে হতো না দেহজীবী নারীদের সংক্ষিপ্ত নামে। অন্যান্য বিধবা আর স্বামী বঞ্চিতা মেয়েদের মায়েরা তাদের আত্মজা সম্পর্কে এতটা নীচ ধারণা পোষণ করেন কি না জানা নেই তার। সব রাগী মেয়েরাই কি শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় বারাঙ্গনায়? স্বামী থাকে না বলে কি সবাই আড়ালে আড়ালে দেহ বিকিয়ে বেড়ায় বা নিত্য-নতুন পুরুষের সান্নিধ্যে নিজের মানসিক বিকৃতি নিরাময়ের সুখ খোঁজে? আর জননীও তখন এমন কিছুরই ইঙ্গিত পেয়ে যান যখন নানা বয়সের পরিচিত পুরুষদের কেউ কেউ ফোনে তার স্বামীহীনা কন্যাটির কুশল-বার্তা জানতে চায় কিংবা অসুস্থতায় কেউ কেউ দেখতে চলে আসে বাসা পর্যন্ত। এমনই নানা জিজ্ঞাসায় রাতের দৈর্ঘ্য বাড়ে। কিন্তু মোহনার চোখে ঘুম আসা তো দূরের কথা একটি হাই পর্যন্ত ওঠে না।
ডাক্তার রেহানা বলেছিল, খাওয়ার দুঘণ্টা আগে খেতে হবে ওষুধ। তারপর দশটা এগারোটার দিকে শুয়ে পড়লেই ঘুম আসবে নিশ্চিত। কিন্তু ডাক্তারদের অনেক অসাড় কথার মতো রেহানার কথাগুলোও কোনো কাজে লাগে নি। ওষুধ খেয়ে দেখেছে সে, নিয়ম মেনে বা না মেনে, আসলে ঘুম যখন আসবার তখনই আসবে। মস্তিষ্কের ভেতরকার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্নায়ুতন্ত্রে যখন বিগত দিনগুলোর যন্ত্রণা অবহেলারা তাদের নখের আঁচড়ে জানিয়ে দিয়ে যায় সামনের দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করছে অথবা কোন ধরনের শূন্যতা ধেয়ে আসছে সে আশঙ্কাতেই যেন টগবগ করে ফুটতে থাকে মস্তিষ্কের যাবতীয় কোষ। আর তাই হয়তো মাথার তালু হয়ে থাকে গনগনে দুপুরে পিচ গলা রাজপথ। নয়তো সারাদিনের ক্লান্তি মাখা চোখে ঘুম তো খুব আরাধ্য কোনো ব্যাপার নয়।
তবে এ সমাজের মানুষ যে স্বামী পরিত্যক্তা মেয়েদের মানুষ বলে ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না বা তারা যে নিতান্তই পথেঘাটে কুড়িয়ে পাবার মতো সুলভ, এমন একটি ব্যাপার বিগত কয়েকটি বছরে বেশ টের পেয়েছে সে। কিন্তু যে পুরুষগুলো ভাবে যে, স্বামীহীনা হলেই তাকে যেনতেন ভাবে বিছানায় পেড়ে ফেলা সম্ভব, তারা কোন গোত্রের মানুষ বা তাদের রুচি-বোধই বা কিসের তৈরি তা ভাবতে গেলে যেন গলা শুকিয়ে আসে তার।
কোনো কোনো গাছ-পালা শীতের শুরুতে যাবতীয় পাতা খুইয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। আবার বসন্তের শুরুতেই দেহে নতুন পাতার সূচনা দিয়ে সাজাতে আরম্ভ করে আরেক জীবন, তেমনি বিভিন্ন সময়ে নতুন করে ফের সব কিছু শুরুর বাসনা যে তার মনে এক আধ বার জাগে নি, সে কথা সে অস্বীকার করবে কীভাবে? আর সেই দুরাশা বা স্বপ্ন যাই হোক না কেন সময়ের ভিন্নতায় চেষ্টা করেছিল আর কিছু না হোক, অবশিষ্ট জীবনে বুকের ভার লাঘব করবার জন্যে হলেও কোনো একজন আপন আর আন্তরিক শ্রোতা চাই। চাই একজন দায়িত্ব সম্পন্ন মানুষের বরাভয়। আর স্বামী ছাড়া জীবনের সে পদটির যোগ্য কে আর হতে পারে? কিন্তু দুবারই তার ভুলের মাশুল দিতে হয়েছে নিদারুণ মনঃকষ্টের ভেতর দিয়ে। শুধু তা হলেও কথা ছিল, সে সব ঘটনার জের এখনো রয়ে গেছে তার জীবনে। যাদের প্রসঙ্গ অনেক রকম ভাবেই ঘুরে ফিরে আসে। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে নানা ভাবে আঘাত আর অপবাদ হয়ে। তা নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাঁকা কথাও হজম করতে হয়। মায়ের ভাষায় সে একজন লোভী নারী। যে নানা ভাবে টাকা-পয়সা খসাতে বা প্রাচুর্যের লোভেই তেমন পুরুষদের বেছে নেয় যাদের বিয়ে করলে কোনো স্বীকৃতি মিলবে না পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনের কাছে। সমাজে মাথা উঁচু করে যাদের পরিচয় দেয়া যাবে না স্বামী হিসেবে। মাঝে মাঝে তার ভীষণ বলতে ইচ্ছে হয়, তাহলে দেখ না কেন যে আমার বয়সে ছোট এমন কোনো যুবক পাত্র? কিন্তু মায়ের মনে কষ্ট হয় এমন কোনো কথা বলতে তার ইচ্ছে হয় না। আর এ দুর্বলতাই মায়ের যা-তা বলার সুযোগ করে দিয়েছে হয়তো। আবার হতে পারে মা কিংবা আত্মীয়-স্বজনরা ধরেই নিয়েছেন যে, বাকি জীবনে আর তার যাবার জায়গা নেই কোথাও, এমন কেউ নেই ভালবেসে তাকে বুকে টেনে নিতে পারে, দিতে পারে চার দেয়ালের নিরাপত্তা। কাজেই শত লাথি-ঝাঁটাতেও শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর ভয়ে মুখ বুজে থাকতে বাধ্য হবে সে। আর তাই কখনো কখনো নিজেকে তুলনা করে সীমার সঙ্গে। ঢাকা শহরে একমাত্র খালা ছাড়া যার কোনো আপন জন ছিলো না। খালা আর খালাতো বোনের হাতে রাত-দিন নানা ভাবে নিগৃহীত হতে হতো তাকে। তিনকুলে যার কেউ নেই তাকে সঙ্গে রাখার লজ্জার খোটাও হজম করতে হতো। যে খোটা শুনবার দুর্ভাগ্য তার শিক্ষা জীবন শেষ করে স্বনির্ভর হওয়ার আগ পর্যন্ত বরণ করতে হয়েছিল। তখন সে ভাবতো যে, মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হয় কী করে?
ব্যাপারটা নিয়ে সে নিজেও ভেবেছে অনেক। মায়ের ভাবনায় যদি এমন কিছু রেখাপাত করেই থাকে, তাও খুব একটা দোষের বলে মনে করে না সে। যেখানে জগতের সব মানুষই ভাবে যে, একাকী নারী বিদুষী হবার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যই বলতে গেলে। তেমন পারিপার্শ্বিকতায় একজন অশিক্ষিত আর টাকা-পয়সার পরিমাণ দিয়ে মানুষের সামাজিক উচ্চতা পরিমাপকারী নারীর ভাবনা আর কতটাই বা উন্নত হতে পারে? যিনি আবাল্য শুনে এসেছেন একাকী নারী নিজে যেমন খারাপ তার সাহচর্যে এলে অন্যরাও খারাপ হতে বাধ্য। এ যেন এক চিরন্তন ভাগ্যলিপি একাকী নারীর জীবনে। তা ছাড়া নারী যে নিতান্তই ভোগ্যপণ্য আব্বাস আর হামিদের আচরণ তা-ই বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে তাকে। যে কারণে সম্পর্ক দুটোই পরপর ছেঁটে ফেলতে হয়েছিল খুব বেশি ভাবনা-চিন্তা না করে।
মাশুকের আচরণে ব্যাপারটা এতই প্রকট ছিল যে, খাওয়া-পরা-প্রসাধন আর ভালো ভালো জায়গায় ঘুরতে ফিরতে পারার মধ্য দিয়েই নারী পরিণত হতে বাধ্য একটি যৌন-যন্ত্রে। যৌনতা ভিন্ন নারীর কাছ থেকে কী আর প্রত্যাশা থাকে পুরুষের? তার মাঝেও দীর্ঘকাল পর হলেও তার বদ্ধমূল এ ধারণায় খানিকটা হলেও চির ধরাতে সক্ষম হয়েছে নেয়ামুল। পুরুষ হলেই যে দৃষ্টিতে লালা ঝরবে নারী দর্শনে বা শরীর ছাড়া যে নারীর কাছে পুরুষের প্রত্যাশার কিছু নেই সে ভাবনা থেকে সরে আসতে প্রথম বাধ্য করেছিল সে। আর তাই হয়তো স্বপ্ন আর দেখবে না দেখবে না করেও কেমন যেন একটা ঘোরের ভেতর দিয়ে কেটে গিয়েছিল তার বেশ কয়েকটি মাস। তার কিছুদিন পরই মহা বিস্ময়ে নিজের দিকে তাকিয়ে অনুভব করতে পারছিল যে, নেয়ামুলের সঙ্গ কামনা করছে প্রবল আসক্তির মতোই। প্রতিদিন ঘুমের আগে মিনিট কয়েক কথা না হলে, সপ্তাহের একটি দিন দেখা না হলে মনে হতে থাকে তার যেন কী নেই। আর সেই নেই নেই ভাব থেকেই দেহমনে ভর করতে থাকে নানা অস্বস্তি। দপদপ করতে থাকে কপালের দুপাশ। মাথার তালুতে যেন জ্বলতে থাকে হাজারো উনুন। পুড়তে থাকে দেহের প্রতিটি অন্ধি-সন্ধি। আরেকটিবার প্রতারিত হলো বুঝি, সে ভয়ানক ভাবনাগুলোও তাকে বাধা দেয় মাথা তুলতে। এক ধরনের সূক্ষ্ম অপরাধ বোধে নাজেহাল হতে থাকে মনের চোরাগলিতে। মানুষ চিনতে তারই বা কেন ভুল হয় বারবার? তার প্রত্যাশা তো তেমন বেশি কিছু ছিল না! নিচু আর স্থূল রুচির মেয়েদের মতো অর্থ-বিত্ত বা প্রাসাদের দাবি তো তার ছিল না কোনো কালেই। হলে ভাল হতো। আর হয় নি বলেও ততটা আক্ষেপ তার নেই। সে চেয়েছিল খানিকটা নির্ভরতা। বিশ্বাসের বৃক্ষতলে মাথার ওপর এক টুকরো শীতল ছায়া। এভাবে কি সে আজীবন পুরুষের পর পুরুষ বাছাই করতে থাকবে যতদিন সঠিক মানুষটির সন্ধান না পায়?
মানুষের জীবন তো অতটা দীর্ঘ নয় যে, যাচাই-বাছাইয়ে কাটিয়ে দেবে অর্ধেক সময়। তাহলে কি সে আর বের হতে পারবে না নৈঃসঙ্গ্যের নির্মম এ ঘেরাটোপ থেকে? কেঁচোর মতো কাদার অন্ধকারে এমন জীবনের কী অর্থ? কী বা এর পরিণতি? তার সব আশা কি নিরাশার ধুলায় মিশে যাবে এভাবেই? তাহলে কি তার নিয়তি মা আর মামাদের করুণার পাত্রী হয়ে কাল কাটানো? মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে বা প্রাপ্ত বয়স্কা হয়ে বাপের কাছে চলে গেলে অথবা মায়ের আকস্মিক মৃত্যু হলে কোথায় হবে তার ঠাঁই? নিজের ঘরেই বন্দী জীবন? নাকি কোনো আত্মীয়ের আশ্রিতা হয়ে বেঁচে থাকা? তা ও যদি ভাগ্যে না জোটে নিজে নিজেই আশ্রয় খুঁজতে যাবে বৃদ্ধাশ্রমে? এখনই তো তাকে নিয়ে ভাবতে চাচ্ছে না কেউ। শেষ জীবনে কি আর তার দিকে দৃষ্টি দেবার সময় হবে কারো?
মায়ের সঙ্গে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবারই মৃদু কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে মোহনার। তার সম্পর্কে মায়ের ধারণা দেখে ভেতরে ভেতরে যেন কষ্টের বরফে জমে যাচ্ছিল। তার কষ্টটা কি কেউ একবার বুঝতে চেষ্টা করবে না? মানুষ এতটা স্বার্থপর হয় কী করে? সন্তান আর জন্মদাত্রীর নানা কথার মাঝে চাপা পড়তে পড়তে বারবারই মনে হচ্ছিল এই বেঁচে থাকা কেন? কিন্তু নেয়ামুলের কথা তখনই তার মনে পড়ে। একবার কথায় কথায় সে বলেছিল, যে টুসিকে কাছে ধরে রাখতে আপনি নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিলেন, এখন যদি মরে যেতে চান ইচ্ছে করে, তাহলে কি তার সঙ্গে প্রতারণা বা অবিচার করা হবে না? সে যতদিন স্বাবলম্বী না হয়, নিজের দায়িত্ব নিজে না নিতে পারে, ততদিন আপনার সাধ আহ্লাদ বা মরে যাওয়ার ভাবনাকে প্রশ্রয় দেয়া উচিত হবে না। এমনও হতে পারে আপনার বিয়ে হয়ে গেলে আপনার মাকে কে দেখবে সে ভয় থেকেই তিনি খারাপ আচরণ করেন বা চরিত্রের দিক দিয়ে আপনাকে আঘাত করেন, যাতে রাগের বশে বা জেদের বশে হলেও আপনার মনের ভেতর অন্য কোনো ভাবনা জায়গা না পায়।
তখন সে নেয়ামুলকে বলেছিল, হ্যাঁ, টুসি তো এমন কথা বলেছে তার নানীর কাছে। মা কার সঙ্গে যেন কথা বলে রাতে, তাই আমার সঙ্গে ঘুমায় না। কদিন পর হয়তো আমাদের ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবে।
কথাটা শুনেই গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল নেয়ামুল। বেশ কিছুক্ষণ পর বলেছিল, একজন মায়ের কাছে সন্তানের চেয়ে অন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। তা ছাড়া আপনার জীবনে আর কাউকে জড়ানোটা উচিতও হবে না। আর জড়ালেও তার পরিণতি ভাল হবে না বলেই আমার ধারণা। শুধু শুধু বাইরের একজনকে কষ্টের ভেতর আটকে রাখা। না পারবেন নিজে সুখী হতে, না পারবেন যাকে জীবনে জড়ালেন তাকে সুখী করতে। একজনের পক্ষে কয়েকটা দিক সামলানো খুব কঠিন ব্যাপার। তবে মেয়েকে বোঝাতে পারতেন আপনার একাকীত্বের ব্যাপারটা।
নেয়ামুলের কথার পিঠে যদিও সে বলেছিল যে, এ কথাও বলেছি।
কী জবাব ছিল তার? সঙ্গে সঙ্গেই ডানা ঝাপটানো পাখির মতো ছটফট করে উঠে বলেছিল নেয়ামুল।
একবার ইচ্ছে হয়েছিল যে, নেয়ামুলের জিজ্ঞাসা এড়িয়ে যাওয়াটাই হয়তো ভাল হবে। কিন্তু তাতে তো তার মন্দভাগ্য বা দুঃসময় কেটে যাবে না। তাই শেষটায় ছোট্ট করে বলেছিল, সে যখন তার বাবার কাছে চলে যাবে, তখনই যেন আমার ফোনের মানুষটার কাছে যাই।
কথা শুনে নেয়ামুল হাসলেও তার হাসিটাকে খুব প্রাণবন্ত মনে হয় নি মোহনার কাছে। মনে হচ্ছিল হাত-পা বেঁধে রেখে যেন তাকে হাসতে বাধ্য করেছে কেউ। নেয়ামুলের ভেতরকার ভাঙচুর বাইরে থেকে দেখা দেখা না গেলেও চেহারায় বিদ্যুচ্চমকের মতো যন্ত্রণার ছাপ আড়াল থাকে নি। নেয়ামুল কি তবে বন্ধুত্বের চাইতেও বেশি কিছু প্রত্যাশা করছে মনে মনে?
মোহনা যদিও সেদিন নেয়ামুলের কাছে কথাগুলো বলেছিল, তবে তা খুব সামান্য। যাকে শুধু আভাস বলা যেতে পারে। কিন্তু সব কথা শুনলে নেয়ামুলের ভাবনা কেমন হতো কে জানে! আসল ব্যাপারটা জানলে কি সে ভয় পেয়ে পিছু হটে যাবে বা তার ভাবনার কথা জানতে পেলে বন্ধুত্বের ছায়া উঠিয়ে নেবে তার ওপর থেকে? আজকাল খুব সামান্যতেই মানুষের বিশ্বাস বোধ আর নির্ভরতায় ফাটল ধরে যায়। নেয়ামুলও কি তবে দূরে সরে যাবে?
ভাবতে ভাবতে চোখ দুটো কেমন জ্বালা করে ওঠে মোহনার। ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দেয় বার কয়েক। আয়নার দিকে চোখ পড়তেই মনের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে ওঠে। এ ক’দিন ঠিক মতো ঘুমাতে না পারার চিহ্ন গাঢ় হয়ে চেপে বসেছে দু চোখের নিচে। বিগত কালের অনিদ্রার কলঙ্ক খুব কষ্টে আর সাধনায় দূর করতে পেরেছিল নেয়ামুলের আন্তরিক সহযোগিতা আর একাগ্রতায়। যে কারণে এক দুদিন ঠিক মতো ঘুম না হলে চোখের নিচের কালি মহা আড়ম্বরে ফিরে আসতে চায়। আর তা দেখলে নেয়ামুল ফের নিশ্চয় বলে উঠবে, আপনাকে আবার পেত্নীর মতো দেখাচ্ছে।
নেয়ামুল হয়তো এমনিই না বুঝে বা তার অতীত সম্পর্কে সবটুকু না জেনেও কথাগুলো বলে ফেলে কথার পিঠে কথা হিসেবে। কিন্তু এতে যে তার অন্তর্গত ক্ষরণের পরিমাণ কতটা বেড়ে যায় নেয়ামুলের তা অজানাই থেকে যাবে কিংবা সে কথা জানার চেষ্টাই করবে না সে কোনো কালে।
রাত ফুরিয়ে আসবার আগে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও চমৎকার হাওয়া আসে বাইরে থেকে। জানালার পর্দাটা বেশ দুলছিল দেখে খানিকটা পেঁচিয়ে গ্রিলের ফাঁকে মুড়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে মোহনা। আর সঙ্গে সঙ্গেই কেমন একটা মন হুহু করা ভাব আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তাকে। সে সময়টা তার জন্যে আরো বেশি মর্ম বিদারী, টুসির ভূমিষ্ঠ-কালীন দৈহিক যন্ত্রণার চেয়েও যেন কয়েক গুন বেশি, যখন কিছুতেই বাধ মানাতে পারে না দু চোখ বেয়ে ছুটে চলা নোনা জলের প্রবাহ। যে প্রবাহ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে আরো দূর নিঃসীম কোনো চরাচরে।
গল্প : জুলিয়ান সিদ্দিকী
যার জন্যে কষ্টকে কষ্ট মনে করে নি, নিদারুণ অপমানের তীব্রতায় বুক ফেটে কান্না এলেও তা গিলে ফেলে বজায় রেখেছিল হাসি হাসি মুখ, তার কাছেই আজ হতে হচ্ছে নানা জিজ্ঞাসায় জর্জরিত। কেন? এসবের কি প্রয়োজন ছিল আদৌ, সেধে সেধে নিজের জন্যে আকাশ ছোঁয়া দামে এত যন্ত্রণা কেনার? অথচ সময় তো পৌঁছে গেছে তার গন্তব্যে। তাকে কি আর ফেরানো যাবে? কোনো মূল্যেই ফেরানো যাবে না বিগত সময়গুলোকে। তার চেয়ে বরং নিজেই সময়ের অতীত হয়ে যাওয়া হয়তো সব দিক থেকে উপযুক্ত।
হঠাৎ হালকা ঘূর্ণি হাওয়ায় জানালার পর্দাটি দুলে উঠলে মুহূর্তেই বাইরে চলে যায় মোহনার দৃষ্টি। রাত-প্রহরী কিশোরটি আজও তার জন্যে নির্দিষ্ট জায়গাটিতে ঠায় বসে আছে সতর্ক দৃষ্টি মেলে, পাছে সামান্য অসতর্কতায় কোনো চতুর ঢুকে পড়ে কিনা কোনো অসাধু উদ্দেশ্য নিয়ে। অবশ্য প্রায়ই মাঝ রাতে শোনা যায় তার প্লাস্টিক কিংবা ধাতব বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে তীক্ষ্ণ শব্দে রাতের নীরবতাকে হরণ করতে। কখনো কখনো নিজেকেই যেন সেই কিশোরটির মতো মনে হয় যার কাঁধে চেপে আছে মহামূল্য সম্পদ কিন্তু প্রাপ্তি অথবা ভোগের ক্ষেত্রে প্রায় শূন্য। এই যে জননী হিসেবে বছরের পর বছর আত্মজার পেছনে ব্যয় করেছে অগণিত মুহূর্ত তার সবই যেন মূল্যহীন হয়ে গেল সামান্য কয়েকটি কথাতে। টুসি যখন বলছিল, তোমার কারণেই তো আব্বুকে কাছে পাই না। তুমি কেন আমাকে জোর করে তোমার কাছে রাখলে?
তখন মস্তিষ্কের যাবতীয় ভাবনা বা উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী কোষগুলো যেন স্থবির হয়ে পড়েছিল মুহূর্তকালের জন্যে। কেমন দিশেহারা মনে হচ্ছিল নিজেকে। সে যেন বোধ-বিবেচনার অতীত হয়ে গিয়েছিল তখন। মেয়ের মুখে এমন কথা শুনতে হবে, ব্যাপারটা কখনোই তার ভাবনাতে উঁকিঝুঁকিও দেয় নি কোনোদিন। অথচ কেমন অবলীলায় কথাগুলো বলে ফেলেছিল টুসি। একবার মনে হয়েছিল যে, আগে বড়দের কারো মুখ থেকে শুনেছিল কোনোদিন তাই হয়তো স্মৃতি থেকে প্রসঙ্গক্রমে উগড়ে দিয়েছিল মাত্র। কিন্তু হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে গিয়েছিল, সপ্তাহ দুয়েক বা মাস খানেক আগে হঠাৎ করেই পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠে এসে গলা জড়িয়ে ধরেছিল টুসি। সে অবাক হয়ে কন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে ঘটনার অন্তরালের ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করছিল আর তখনই আদুরে গলায় বলে উঠেছিল সে, তুমি শুধুই আমার একার আম্মু হয়ে থাকো। আর কারো কিছু হতে হবে না।
টুসির কথার ভেতর এতটাই সূক্ষ্ম অথচ ভয়াবহ একটি দাবি প্রচ্ছন্ন ছিল যা সঙ্গে সঙ্গেই ধরতে পারে নি মোহনা। পরদিন টিচার্স কমন রুমে অফ পিরিয়ডে বসে বসে পত্রিকার পাতা ওলটাতে ওলটাতে অকস্মাৎ তার ভাবনায় খেলে গিয়েছিল টুসির কথার অন্তর্নিহিত রহস্যটি। সেই সঙ্গে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল টুসির গোপন জগতটি। যেখানে আর কারো উপস্থিতি তার সহ্য হবে না বা মেনে নেবে না তার বাবার আসনের বিচ্যুতি। আর টুসির প্রচ্ছন্ন দাবিটুকুর নানা দিক ভাবতে ভাবতে ভেতরে ভেতরে এতটাই গুটিয়ে যাচ্ছিল যে, ঠিক প্লাস্টিকের কিছু পুড়তে থাকলে তা গুটিয়ে যেতে যেতে আকারও বদলাতে থাকে চার পাশ থেকে। ইংরেজির টিচার সুরাইয়া তা দেখতে পেয়েই যেন বলে উঠেছিল, তোমার কি খারাপ লাগছে আপা? প্রেশারটা কি আবার…
সুরাইয়া কথা শেষ না করলেও মোহনা বলেছিল, না। তেমন কিছু না। বলতে বলতে মাথা নেড়েছিল। তারপর স্কুল ছুটির পর সরাসরি বাসায় না ফিরে চলে গিয়েছিল টুসির স্কুলে। ছুটি হতেই বাইরে বেরিয়ে মাকে দেখতে পেয়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো ছুটে এসে কোমর জড়িয়ে ধরেছিল টুসি। মেয়ের এমন খুশি হওয়াটা সে দেখতে চায় সেদিনই যেদিন চারদিকের অন্ধকারেরা হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে ক্রমশ তাকে কোণঠাসা করে ফেলতে চায়।
মোহনা সেদিন বন্ধুর মতো বা ঠিক টুসির বয়সের সঙ্গে মিশে গিয়ে আবিষ্কার করতে চেষ্টা করেছিল তার মনের আভ্যন্তরীণ দিকটা। আর অবাক-বিস্ময়ে আবিষ্কার করতে পেরেছিল সেখানে মাশুক ছাড়া আর কেউ নেই। এমন একটা বাচ্চা মানুষ মনের এতটা গভীরে তার জন্মদাতাকে অনুভব করে যার যোগ্যতার ছিটেফোঁটা মাশুকের মাঝে নেই।
একবার মনে হয়েছিল দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষার কথাটি। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাতিল করে দিতে হয়েছিল ভাবনাটিকে। টুসি ছেলেমানুষ। ক্লাস সেভেনের একটি মেয়ে জগত-সংসার বা স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের কতটুকুই আর বোঝে! তার পরও ভাবনাটির কুটো-কাঁটা যেন মনের ভেতরকার হাজারো কাজের অকাজের ভাবনার ফাঁক-ফোকরে কোথাও আটকে ছিল হয়তো। নৈঃসঙ্গ্য আর রাতের নৈঃশব্দ্যের সুযোগে কখন পরিপূর্ণ হয়ে ভাবনাটি ফের সচল হয়ে উঠেছে টের পায় নি মোহনা। থেকে থেকেই নানা জিজ্ঞাসার রূপ ধরে হাওয়ায় ভাসমান পরিত্যক্ত হালকা পালকের মতো মনের এখানে সেখানে উঁকি দিয়ে যাচ্ছিল বারবার।
আচ্ছা, তাহলে কি ভুলই করল সে? যে সন্তান তার পিতার সান্নিধ্য কামনা করে প্রবল ভাবে, তাকে কি এভাবে বঞ্চিত করা ঠিক হয়েছে? বঞ্চিতই বা সে করছে কীভাবে? পিতা হিসেবে তো মাশুকের কম বেশি দায়-দায়িত্ব আছে কন্যার প্রতি। কিন্তু তা কি সে পালন করছে ঠিক মতো? নাকি খোঁজ-খবর করে নিয়মিত? টুসিকে কে বোঝাবে তার পেছনে যা খরচ হচ্ছে বা সে এ পর্যন্ত বড় হয়ে বাপের পক্ষে যে ওকালতি করে, তার জীবনে কেবল জন্ম দেওয়াটা ছাড়া বাপের কোনো অবদান নেই? আর সে কথা বোঝাতে গেলেও বাপ-ভক্ত কন্যার চোখ ছলছল হয়ে ওঠে সব সময়। সে যে বাপের বিপক্ষে কোনো যুক্তি শুনতে বা বুঝতে চায় না ইচ্ছে করেই, তাও গোপন থাকে না তার নীরবতায়। আসলে বাপ যে তাকে কতটা অবহেলা করে তা তার বোধে নিজ থেকে কোনোদিন না জাগলে বলে কয়ে তা জাগানো অসম্ভব। আর তা সম্ভব নয় বলেই, সে চেষ্টাও সে বাদ দিয়েছে অনেক কাল আগে। কিন্তু তবু তো এতটা ব্যয় দেবার পরও গর্ভ-নিঃসৃত কন্যার চোখে নিজেকেই অপরাধী সাব্যস্ত হতে হলো শেষপর্যন্ত। কী প্রয়োজন ছিল এ সবের?
নিজেকেই যেন সান্ত্বনা দেওয়া নানা জিজ্ঞাসার আড়ালে। সে যদি নিজের সিদ্ধান্তে অটল না থেকে মাশুকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করতো, প্রতিদিনের যন্ত্রণাগুলোকে যদি অন্যান্য মেয়েদের মতো সবার দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রাখতে চেষ্টা করতো, পশুর সমপর্যায়ে নেমে গিয়ে যদি সব কিছু মেনে নিতে পারতো মুখ বুজে কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে আবিষ্কার করে নিতে পারত বিকল্প স্রোতের মাঝে কিছুক্ষণের জন্যে ভেসে চলার বিবিধ পন্থা, এমন নষ্ট-ভ্রষ্ট হয়ে মালিনী অথবা পাপিয়ারা যেমন বেশ আছে বলে দাবি করে, তাহলে হয়তো আজ তাকে বিরূপ কিছু শুনতে হতো না। পাড়া-পড়শি আত্মীয়-স্বজন থেকে আরম্ভ করে নিজের ঘরেই শিকার হতে হতো না বাঁকা দৃষ্টির। জন্মদাত্রীর মুখে সম্বোধিত হতে হতো না দেহজীবী নারীদের সংক্ষিপ্ত নামে। অন্যান্য বিধবা আর স্বামী বঞ্চিতা মেয়েদের মায়েরা তাদের আত্মজা সম্পর্কে এতটা নীচ ধারণা পোষণ করেন কি না জানা নেই তার। সব রাগী মেয়েরাই কি শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় বারাঙ্গনায়? স্বামী থাকে না বলে কি সবাই আড়ালে আড়ালে দেহ বিকিয়ে বেড়ায় বা নিত্য-নতুন পুরুষের সান্নিধ্যে নিজের মানসিক বিকৃতি নিরাময়ের সুখ খোঁজে? আর জননীও তখন এমন কিছুরই ইঙ্গিত পেয়ে যান যখন নানা বয়সের পরিচিত পুরুষদের কেউ কেউ ফোনে তার স্বামীহীনা কন্যাটির কুশল-বার্তা জানতে চায় কিংবা অসুস্থতায় কেউ কেউ দেখতে চলে আসে বাসা পর্যন্ত। এমনই নানা জিজ্ঞাসায় রাতের দৈর্ঘ্য বাড়ে। কিন্তু মোহনার চোখে ঘুম আসা তো দূরের কথা একটি হাই পর্যন্ত ওঠে না।
ডাক্তার রেহানা বলেছিল, খাওয়ার দুঘণ্টা আগে খেতে হবে ওষুধ। তারপর দশটা এগারোটার দিকে শুয়ে পড়লেই ঘুম আসবে নিশ্চিত। কিন্তু ডাক্তারদের অনেক অসাড় কথার মতো রেহানার কথাগুলোও কোনো কাজে লাগে নি। ওষুধ খেয়ে দেখেছে সে, নিয়ম মেনে বা না মেনে, আসলে ঘুম যখন আসবার তখনই আসবে। মস্তিষ্কের ভেতরকার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্নায়ুতন্ত্রে যখন বিগত দিনগুলোর যন্ত্রণা অবহেলারা তাদের নখের আঁচড়ে জানিয়ে দিয়ে যায় সামনের দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করছে অথবা কোন ধরনের শূন্যতা ধেয়ে আসছে সে আশঙ্কাতেই যেন টগবগ করে ফুটতে থাকে মস্তিষ্কের যাবতীয় কোষ। আর তাই হয়তো মাথার তালু হয়ে থাকে গনগনে দুপুরে পিচ গলা রাজপথ। নয়তো সারাদিনের ক্লান্তি মাখা চোখে ঘুম তো খুব আরাধ্য কোনো ব্যাপার নয়।
তবে এ সমাজের মানুষ যে স্বামী পরিত্যক্তা মেয়েদের মানুষ বলে ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না বা তারা যে নিতান্তই পথেঘাটে কুড়িয়ে পাবার মতো সুলভ, এমন একটি ব্যাপার বিগত কয়েকটি বছরে বেশ টের পেয়েছে সে। কিন্তু যে পুরুষগুলো ভাবে যে, স্বামীহীনা হলেই তাকে যেনতেন ভাবে বিছানায় পেড়ে ফেলা সম্ভব, তারা কোন গোত্রের মানুষ বা তাদের রুচি-বোধই বা কিসের তৈরি তা ভাবতে গেলে যেন গলা শুকিয়ে আসে তার।
কোনো কোনো গাছ-পালা শীতের শুরুতে যাবতীয় পাতা খুইয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। আবার বসন্তের শুরুতেই দেহে নতুন পাতার সূচনা দিয়ে সাজাতে আরম্ভ করে আরেক জীবন, তেমনি বিভিন্ন সময়ে নতুন করে ফের সব কিছু শুরুর বাসনা যে তার মনে এক আধ বার জাগে নি, সে কথা সে অস্বীকার করবে কীভাবে? আর সেই দুরাশা বা স্বপ্ন যাই হোক না কেন সময়ের ভিন্নতায় চেষ্টা করেছিল আর কিছু না হোক, অবশিষ্ট জীবনে বুকের ভার লাঘব করবার জন্যে হলেও কোনো একজন আপন আর আন্তরিক শ্রোতা চাই। চাই একজন দায়িত্ব সম্পন্ন মানুষের বরাভয়। আর স্বামী ছাড়া জীবনের সে পদটির যোগ্য কে আর হতে পারে? কিন্তু দুবারই তার ভুলের মাশুল দিতে হয়েছে নিদারুণ মনঃকষ্টের ভেতর দিয়ে। শুধু তা হলেও কথা ছিল, সে সব ঘটনার জের এখনো রয়ে গেছে তার জীবনে। যাদের প্রসঙ্গ অনেক রকম ভাবেই ঘুরে ফিরে আসে। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে নানা ভাবে আঘাত আর অপবাদ হয়ে। তা নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাঁকা কথাও হজম করতে হয়। মায়ের ভাষায় সে একজন লোভী নারী। যে নানা ভাবে টাকা-পয়সা খসাতে বা প্রাচুর্যের লোভেই তেমন পুরুষদের বেছে নেয় যাদের বিয়ে করলে কোনো স্বীকৃতি মিলবে না পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনের কাছে। সমাজে মাথা উঁচু করে যাদের পরিচয় দেয়া যাবে না স্বামী হিসেবে। মাঝে মাঝে তার ভীষণ বলতে ইচ্ছে হয়, তাহলে দেখ না কেন যে আমার বয়সে ছোট এমন কোনো যুবক পাত্র? কিন্তু মায়ের মনে কষ্ট হয় এমন কোনো কথা বলতে তার ইচ্ছে হয় না। আর এ দুর্বলতাই মায়ের যা-তা বলার সুযোগ করে দিয়েছে হয়তো। আবার হতে পারে মা কিংবা আত্মীয়-স্বজনরা ধরেই নিয়েছেন যে, বাকি জীবনে আর তার যাবার জায়গা নেই কোথাও, এমন কেউ নেই ভালবেসে তাকে বুকে টেনে নিতে পারে, দিতে পারে চার দেয়ালের নিরাপত্তা। কাজেই শত লাথি-ঝাঁটাতেও শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর ভয়ে মুখ বুজে থাকতে বাধ্য হবে সে। আর তাই কখনো কখনো নিজেকে তুলনা করে সীমার সঙ্গে। ঢাকা শহরে একমাত্র খালা ছাড়া যার কোনো আপন জন ছিলো না। খালা আর খালাতো বোনের হাতে রাত-দিন নানা ভাবে নিগৃহীত হতে হতো তাকে। তিনকুলে যার কেউ নেই তাকে সঙ্গে রাখার লজ্জার খোটাও হজম করতে হতো। যে খোটা শুনবার দুর্ভাগ্য তার শিক্ষা জীবন শেষ করে স্বনির্ভর হওয়ার আগ পর্যন্ত বরণ করতে হয়েছিল। তখন সে ভাবতো যে, মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হয় কী করে?
ব্যাপারটা নিয়ে সে নিজেও ভেবেছে অনেক। মায়ের ভাবনায় যদি এমন কিছু রেখাপাত করেই থাকে, তাও খুব একটা দোষের বলে মনে করে না সে। যেখানে জগতের সব মানুষই ভাবে যে, একাকী নারী বিদুষী হবার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যই বলতে গেলে। তেমন পারিপার্শ্বিকতায় একজন অশিক্ষিত আর টাকা-পয়সার পরিমাণ দিয়ে মানুষের সামাজিক উচ্চতা পরিমাপকারী নারীর ভাবনা আর কতটাই বা উন্নত হতে পারে? যিনি আবাল্য শুনে এসেছেন একাকী নারী নিজে যেমন খারাপ তার সাহচর্যে এলে অন্যরাও খারাপ হতে বাধ্য। এ যেন এক চিরন্তন ভাগ্যলিপি একাকী নারীর জীবনে। তা ছাড়া নারী যে নিতান্তই ভোগ্যপণ্য আব্বাস আর হামিদের আচরণ তা-ই বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে তাকে। যে কারণে সম্পর্ক দুটোই পরপর ছেঁটে ফেলতে হয়েছিল খুব বেশি ভাবনা-চিন্তা না করে।
মাশুকের আচরণে ব্যাপারটা এতই প্রকট ছিল যে, খাওয়া-পরা-প্রসাধন আর ভালো ভালো জায়গায় ঘুরতে ফিরতে পারার মধ্য দিয়েই নারী পরিণত হতে বাধ্য একটি যৌন-যন্ত্রে। যৌনতা ভিন্ন নারীর কাছ থেকে কী আর প্রত্যাশা থাকে পুরুষের? তার মাঝেও দীর্ঘকাল পর হলেও তার বদ্ধমূল এ ধারণায় খানিকটা হলেও চির ধরাতে সক্ষম হয়েছে নেয়ামুল। পুরুষ হলেই যে দৃষ্টিতে লালা ঝরবে নারী দর্শনে বা শরীর ছাড়া যে নারীর কাছে পুরুষের প্রত্যাশার কিছু নেই সে ভাবনা থেকে সরে আসতে প্রথম বাধ্য করেছিল সে। আর তাই হয়তো স্বপ্ন আর দেখবে না দেখবে না করেও কেমন যেন একটা ঘোরের ভেতর দিয়ে কেটে গিয়েছিল তার বেশ কয়েকটি মাস। তার কিছুদিন পরই মহা বিস্ময়ে নিজের দিকে তাকিয়ে অনুভব করতে পারছিল যে, নেয়ামুলের সঙ্গ কামনা করছে প্রবল আসক্তির মতোই। প্রতিদিন ঘুমের আগে মিনিট কয়েক কথা না হলে, সপ্তাহের একটি দিন দেখা না হলে মনে হতে থাকে তার যেন কী নেই। আর সেই নেই নেই ভাব থেকেই দেহমনে ভর করতে থাকে নানা অস্বস্তি। দপদপ করতে থাকে কপালের দুপাশ। মাথার তালুতে যেন জ্বলতে থাকে হাজারো উনুন। পুড়তে থাকে দেহের প্রতিটি অন্ধি-সন্ধি। আরেকটিবার প্রতারিত হলো বুঝি, সে ভয়ানক ভাবনাগুলোও তাকে বাধা দেয় মাথা তুলতে। এক ধরনের সূক্ষ্ম অপরাধ বোধে নাজেহাল হতে থাকে মনের চোরাগলিতে। মানুষ চিনতে তারই বা কেন ভুল হয় বারবার? তার প্রত্যাশা তো তেমন বেশি কিছু ছিল না! নিচু আর স্থূল রুচির মেয়েদের মতো অর্থ-বিত্ত বা প্রাসাদের দাবি তো তার ছিল না কোনো কালেই। হলে ভাল হতো। আর হয় নি বলেও ততটা আক্ষেপ তার নেই। সে চেয়েছিল খানিকটা নির্ভরতা। বিশ্বাসের বৃক্ষতলে মাথার ওপর এক টুকরো শীতল ছায়া। এভাবে কি সে আজীবন পুরুষের পর পুরুষ বাছাই করতে থাকবে যতদিন সঠিক মানুষটির সন্ধান না পায়?
মানুষের জীবন তো অতটা দীর্ঘ নয় যে, যাচাই-বাছাইয়ে কাটিয়ে দেবে অর্ধেক সময়। তাহলে কি সে আর বের হতে পারবে না নৈঃসঙ্গ্যের নির্মম এ ঘেরাটোপ থেকে? কেঁচোর মতো কাদার অন্ধকারে এমন জীবনের কী অর্থ? কী বা এর পরিণতি? তার সব আশা কি নিরাশার ধুলায় মিশে যাবে এভাবেই? তাহলে কি তার নিয়তি মা আর মামাদের করুণার পাত্রী হয়ে কাল কাটানো? মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে বা প্রাপ্ত বয়স্কা হয়ে বাপের কাছে চলে গেলে অথবা মায়ের আকস্মিক মৃত্যু হলে কোথায় হবে তার ঠাঁই? নিজের ঘরেই বন্দী জীবন? নাকি কোনো আত্মীয়ের আশ্রিতা হয়ে বেঁচে থাকা? তা ও যদি ভাগ্যে না জোটে নিজে নিজেই আশ্রয় খুঁজতে যাবে বৃদ্ধাশ্রমে? এখনই তো তাকে নিয়ে ভাবতে চাচ্ছে না কেউ। শেষ জীবনে কি আর তার দিকে দৃষ্টি দেবার সময় হবে কারো?
মায়ের সঙ্গে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবারই মৃদু কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে মোহনার। তার সম্পর্কে মায়ের ধারণা দেখে ভেতরে ভেতরে যেন কষ্টের বরফে জমে যাচ্ছিল। তার কষ্টটা কি কেউ একবার বুঝতে চেষ্টা করবে না? মানুষ এতটা স্বার্থপর হয় কী করে? সন্তান আর জন্মদাত্রীর নানা কথার মাঝে চাপা পড়তে পড়তে বারবারই মনে হচ্ছিল এই বেঁচে থাকা কেন? কিন্তু নেয়ামুলের কথা তখনই তার মনে পড়ে। একবার কথায় কথায় সে বলেছিল, যে টুসিকে কাছে ধরে রাখতে আপনি নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিলেন, এখন যদি মরে যেতে চান ইচ্ছে করে, তাহলে কি তার সঙ্গে প্রতারণা বা অবিচার করা হবে না? সে যতদিন স্বাবলম্বী না হয়, নিজের দায়িত্ব নিজে না নিতে পারে, ততদিন আপনার সাধ আহ্লাদ বা মরে যাওয়ার ভাবনাকে প্রশ্রয় দেয়া উচিত হবে না। এমনও হতে পারে আপনার বিয়ে হয়ে গেলে আপনার মাকে কে দেখবে সে ভয় থেকেই তিনি খারাপ আচরণ করেন বা চরিত্রের দিক দিয়ে আপনাকে আঘাত করেন, যাতে রাগের বশে বা জেদের বশে হলেও আপনার মনের ভেতর অন্য কোনো ভাবনা জায়গা না পায়।
তখন সে নেয়ামুলকে বলেছিল, হ্যাঁ, টুসি তো এমন কথা বলেছে তার নানীর কাছে। মা কার সঙ্গে যেন কথা বলে রাতে, তাই আমার সঙ্গে ঘুমায় না। কদিন পর হয়তো আমাদের ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবে।
কথাটা শুনেই গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল নেয়ামুল। বেশ কিছুক্ষণ পর বলেছিল, একজন মায়ের কাছে সন্তানের চেয়ে অন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। তা ছাড়া আপনার জীবনে আর কাউকে জড়ানোটা উচিতও হবে না। আর জড়ালেও তার পরিণতি ভাল হবে না বলেই আমার ধারণা। শুধু শুধু বাইরের একজনকে কষ্টের ভেতর আটকে রাখা। না পারবেন নিজে সুখী হতে, না পারবেন যাকে জীবনে জড়ালেন তাকে সুখী করতে। একজনের পক্ষে কয়েকটা দিক সামলানো খুব কঠিন ব্যাপার। তবে মেয়েকে বোঝাতে পারতেন আপনার একাকীত্বের ব্যাপারটা।
নেয়ামুলের কথার পিঠে যদিও সে বলেছিল যে, এ কথাও বলেছি।
কী জবাব ছিল তার? সঙ্গে সঙ্গেই ডানা ঝাপটানো পাখির মতো ছটফট করে উঠে বলেছিল নেয়ামুল।
একবার ইচ্ছে হয়েছিল যে, নেয়ামুলের জিজ্ঞাসা এড়িয়ে যাওয়াটাই হয়তো ভাল হবে। কিন্তু তাতে তো তার মন্দভাগ্য বা দুঃসময় কেটে যাবে না। তাই শেষটায় ছোট্ট করে বলেছিল, সে যখন তার বাবার কাছে চলে যাবে, তখনই যেন আমার ফোনের মানুষটার কাছে যাই।
কথা শুনে নেয়ামুল হাসলেও তার হাসিটাকে খুব প্রাণবন্ত মনে হয় নি মোহনার কাছে। মনে হচ্ছিল হাত-পা বেঁধে রেখে যেন তাকে হাসতে বাধ্য করেছে কেউ। নেয়ামুলের ভেতরকার ভাঙচুর বাইরে থেকে দেখা দেখা না গেলেও চেহারায় বিদ্যুচ্চমকের মতো যন্ত্রণার ছাপ আড়াল থাকে নি। নেয়ামুল কি তবে বন্ধুত্বের চাইতেও বেশি কিছু প্রত্যাশা করছে মনে মনে?
মোহনা যদিও সেদিন নেয়ামুলের কাছে কথাগুলো বলেছিল, তবে তা খুব সামান্য। যাকে শুধু আভাস বলা যেতে পারে। কিন্তু সব কথা শুনলে নেয়ামুলের ভাবনা কেমন হতো কে জানে! আসল ব্যাপারটা জানলে কি সে ভয় পেয়ে পিছু হটে যাবে বা তার ভাবনার কথা জানতে পেলে বন্ধুত্বের ছায়া উঠিয়ে নেবে তার ওপর থেকে? আজকাল খুব সামান্যতেই মানুষের বিশ্বাস বোধ আর নির্ভরতায় ফাটল ধরে যায়। নেয়ামুলও কি তবে দূরে সরে যাবে?
ভাবতে ভাবতে চোখ দুটো কেমন জ্বালা করে ওঠে মোহনার। ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দেয় বার কয়েক। আয়নার দিকে চোখ পড়তেই মনের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে ওঠে। এ ক’দিন ঠিক মতো ঘুমাতে না পারার চিহ্ন গাঢ় হয়ে চেপে বসেছে দু চোখের নিচে। বিগত কালের অনিদ্রার কলঙ্ক খুব কষ্টে আর সাধনায় দূর করতে পেরেছিল নেয়ামুলের আন্তরিক সহযোগিতা আর একাগ্রতায়। যে কারণে এক দুদিন ঠিক মতো ঘুম না হলে চোখের নিচের কালি মহা আড়ম্বরে ফিরে আসতে চায়। আর তা দেখলে নেয়ামুল ফের নিশ্চয় বলে উঠবে, আপনাকে আবার পেত্নীর মতো দেখাচ্ছে।
নেয়ামুল হয়তো এমনিই না বুঝে বা তার অতীত সম্পর্কে সবটুকু না জেনেও কথাগুলো বলে ফেলে কথার পিঠে কথা হিসেবে। কিন্তু এতে যে তার অন্তর্গত ক্ষরণের পরিমাণ কতটা বেড়ে যায় নেয়ামুলের তা অজানাই থেকে যাবে কিংবা সে কথা জানার চেষ্টাই করবে না সে কোনো কালে।
রাত ফুরিয়ে আসবার আগে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও চমৎকার হাওয়া আসে বাইরে থেকে। জানালার পর্দাটা বেশ দুলছিল দেখে খানিকটা পেঁচিয়ে গ্রিলের ফাঁকে মুড়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে মোহনা। আর সঙ্গে সঙ্গেই কেমন একটা মন হুহু করা ভাব আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তাকে। সে সময়টা তার জন্যে আরো বেশি মর্ম বিদারী, টুসির ভূমিষ্ঠ-কালীন দৈহিক যন্ত্রণার চেয়েও যেন কয়েক গুন বেশি, যখন কিছুতেই বাধ মানাতে পারে না দু চোখ বেয়ে ছুটে চলা নোনা জলের প্রবাহ। যে প্রবাহ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে আরো দূর নিঃসীম কোনো চরাচরে।
গল্প : জুলিয়ান সিদ্দিকী

No comments:
Post a Comment